নামায : আমার প্রভুর কাছে সর্বদায় আত্মসমর্র্পণ

নিশ্চয় আমি আল্লাহ্‌।  আমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই।  অতএব শুধু আমারই বন্দেগী কর এবং আমার ইয়াদের জন্যে নামায কায়েম কর। ”(তাহা : ১৪)

ফারসী শব্দ নামায একটি সুপরিচিত শব্দ।  কুরআনের পরিভাষায় ‘সালাতের’ স্থলে নামায ব্যবহৃত হয়।  সালাত   এর আভিধানিক অর্থ কারো দিকে মুখ করা, অগ্রসর হওয়া, তাঁর কাছেই চাওয়া এবং তাঁর একেবারে হওয়া।   এবং সিজদা কর এবং আল্লাহর নিকটবর্তী হও। ”(আলাক : ১৯)

হাদীসে আছে :

“বান্দাহ ঐ সময়ে তার আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়, যখন সে আমার সামনে সিজদায় থাকে। ”(মুসলিম)

“তোমাদের মধ্যে যখন কেউ নামাযে রত হয়, তখন সে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করে। ”(বুখারী)

 নামাযে আমরা কি পড়ি :

নামায মানুষকে আল্লাহর ইবাদাত, দাসত্ব ও আনুগত্য স্বীকার করে চলার জন্য প্রস্তুত করে সর্বোতভাবে।  নামাযের দোআ ও সূরাগুলোতে আমরা যা বলি, তা যদি আমরা হৃদয়মন দিয়ে উপলব্ধি করি তবে তা আমাদের বিশ্বাস, মতবাদ,

চিন্তাচেতনায়, স্বভাব ও জীবনবোধে যে কি অবিস্মরণীয় পরিবর্তন আনতে পারে তা আমি বছর খানেক ধরে এত বেশি উপলব্ধি করেছি যে আল্লাহর দ্বীনের পথে পথচলার যাত্রীদের এই উপলব্ধি দ্বারা উপকৃত করতে ব্যাকুলভাবে লিখছি।

আমি নামায সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছিলাম মুহতারাম মাওলানা মওদূদীর ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষা (নামাজের হাকীকত অংশ) এবং অনুপ্রাণিত হয়েছি।  এছাড়াও আমি কিছু বই থেকে জ্ঞান অর্জন করেছিলাম এবং অনুপ্রাণিত হয়েছি যা পরবর্তীতে রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করবো ইনশায়াল্লাহ।

একটু আগে থেকেই আসি।  আযান যে এক অবিস্মরণীয় আহবানের বার্তা দৈনিক পাঁচবার যখন আমাদের নামাজে আযান দিয়ে ডাকা হয় কী বলা হয় তখন ?

‘আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ সকলের বড়। ’

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ভিন্ন আর কেউ মাবুদ নেই।  বন্দেগীর যোগ্য আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই।

‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। ’

‘নামাজের জন্য আস। ’

‘যে কাজে কল্যাণ ও মঙ্গল সেই কাজের দিকে আস। ’

‘আল্লাহ সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে বড়। ’

‘আল্লাহ ভিন্ন কোন মাবুদ নেই। ’

এ ডাক কত বড় শক্তিশালী ডাক ! এ ডাক প্রত্যেক দিন পাঁচবার আমাদেরকে এ কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়, পৃথিবীতে যতবড় খোদায়ীর দাবীদার দেখা যাচ্ছে তারা সবাই মিথ্যাবাদী, আকাশ ও পৃথিবীতে মাত্র একজনই খোদায়ী ও প্রভুত্বের অধিকারী এবং কেবল তিনি ইবাদাতের যোগ্য।  সুতরাং আমরা সকলে মিলে তো তারই ইবাদাত করবো।  তাঁর ইবাদাতেই আমাদের সকলের জন্য ইহকালের ও পরকালে প্রকৃত কল্যাণ নিহিত। ”

এ মর্মস্পর্শী আওয়াজ শুনে কে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে পারে ? এ ডাক শুনেই আমরা উঠে পড়ি এবং সর্বপ্রথমেই

চিন্তা করে দেখি আমি কি পবিত্র না অপবিত্র? অথবা আমার জামা কাপড় পবিত্র কিনা ? উভয় জাহানের বাদশাহের দরবারে হাজিরা দেবার বিষয়টি পৃথিবীর সকল বিষয় হতে সম্পূর্ণরুপে  স্বতন্ত্র| অনন্য।

ওজু করার পর আমরা যে দোয়া পড়ি-

“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক ও অদ্বিতীয় লা-শরীক আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বুদ নেই।  এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর বান্দাহ এবং রাসূল।  হে আল্লাহ, তুমি আমাকে তওবাকারীদের অন্তর্ভূক্ত কর এবং আমাকে পবিত্রতা অবলম্বনকারী বানাও। ”

জায়নামাজে দাঁড়িয়েই একনিষ্ঠ অনুভূতির সাথে আমরা নিম্নের দোয়া পড়ি-

আমি পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে আমার মুখ সেই সত্তার দিকে ফিরিয়ে নিয়েছি যিনি আসমান ও যমীন পয়দা করেছেন এবং আমি তাদের মধ্যে নই যারা তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করে।  বস্তুত আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও মৃত্যু একমাত্র আল্লাহরই জন্যে যিনি সমগ্র বিশ্বজগতের মালিক প্রভু।  তাঁর কোন শরীক নেই, আমার উপরে তাঁরই হুকুম হয়েছে এবং অনুগতদের মধ্যে আমিই সকলের প্রথম অনুগত।  (আল-আনয়াম)

দৃষ্টি সিজদার স্থানের উপর নিবদ্ধ রেখে বলি-

আল্লাহু আকবর আল্লাহ মহান।

তারপর নিম্নের দোয়া বা সানা পড়ছি-

তুমি পাক ও পবিত্র, হে আল্লাহ ! তুমিই প্রশংসার উপযুক্ত।  তুমি বরকতদানকারী এবং মহান।  তোমার নাম ও মর্যাদা বহু উচ্চে।  তুমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই।

এরপর বলছি-

“বিতাড়িত শয়তান থেকে পানাহ  চাচ্ছি  আল্লাহর  কাছে। ”

“মেহেরবান দয়াময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। ”

পড়ছি সুরা ফাতিহা-

-‘সারা জাহানের পালনকর্তা মহান আল্লাহর জন্যই সমগ্র ও সর্বপ্রকার তারীফ-প্রশংসা।

-তিনি অত্যন্ত দয়াময় ও মেহেরবান।   -তিনি বিচার দিনের একমাত্র মালিক।  সেদিন মানুষের যাবতীয় কর্মের বিচার করা হবে এবং প্রত্যেককে তাঁর কর্মের ফল ভোগ করতে হবে।

-হে মালিক ! আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং কেবল তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি।

-আমাদেরকে সহজ, সোজা, সঠিক পথ দেখাও।

-তাদের পথ, যারা তোমার অনুগ্রহ ও পুরস্কারপ্রাপ্ত।

-আর যারা অভিশপ্ত ও ভ্রান্ত পথে পরিচালিত নয়।

-হে আল্লাহ! আমাদের দোয়া কবুল কর, মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করো।

এক অমৃত আত্মসমর্পণ সূরা ফাতিহা।  আমার সারা জাহানের পালন কর্তা মহান আল্লাহর জন্যই সব প্রশংসা।  আমি সর্বদিক থেকে মুখফিরিয়ে শুধু তাঁরই দিকে অবতীর্ণ হলাম।  বস্তুত: আমার সমর্পণ, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মৃত্যুতো শুধু তাঁরই জন্য।  শুধু তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই আমার বেঁচে থাকা।  সেই সাথে আমিতো শুধু সেই পথ চাই, যে পথ সবচেয়ে সঠিক, সবচেয়ে সুন্দর সিরাতুল মুস্তাকীম-সত্য, সঠিক।  সেই সমুজ্জ্বল রাজপথের যাত্রীই তো আমি হতে চাই।  সেই তাদের পথে যারা অনুগ্রহপ্রাপ্ত, পুরস্কারপ্রাপ্ত।  সেই অভিশপ্ত, ভ্রান্ত পথের ধারকদের পথে নয়।  আমরা তো শুধু সেই মহামহিম প্রভুর ইবাদত করি, যার কর্তৃত্ব সর্বব্যাপী, আসমান-জমীন সর্বত্র।  যার প্রভুত্ব বরণ করে পৃথিবীর সকল শক্তির দাসত্ব থেকে আমি মুক্ত হয়েছি।  আমার সাড়ে তিন হাত দেহ, মন ও মস্তিষ্কের সম্পূর্ণটা দিয়েই আমি শুধুই তাঁরই কাছে নত হয়েছি।  তিনিই যে শুধু আমার মালিক।  আর যে মালিক মর্যাদা দিয়েছেন যে আমি আশরাফুল মাখলুকাত।  তাঁর সৃষ্ট সমগ্র সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ যে গর্বিত আমি শুধু তাঁরই ইবাদত করি।  আর তাই তাঁর কাছেই সাহায্য চাই।  তিনিই যে একমাত্র পরাক্রমশালী, একমাত্র ক্ষমতাবান রব।  তিনি অত্যন্ত দয়াবান।  তিনিই যে বিচার দিনের একমাত্র মালিক! সেই মহাফয়সালার দিন।  যেদিন মানুষের যাবতীয় কর্মের বিচার হবে।  আর প্রত্যেককে তাঁর কর্মের ফলভোগ করতে হবে।  সারা জাহানের পালনকর্তা মহান আল্লাহর জন্যই আমার সমগ্র ও সর্বপ্রকার তারিফ-প্রশংসা।

আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাকে নামাজী হিসেবে কবুল করেছেন।  মানুষ তো সৃষ্টিগতভাবেই কোন উদ্ধর্তন শক্তির কাছে মাথা নত করে।  আলহামদুলিল্লাহ, আমি নত হয়েছি আমার প্রিয় প্রভুর কাছে।  এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কি আছে

আমরা এই অমৃত সূরা ফাতিহাসহ নামাজের প্রথম থেকে এ পর্যন্ত দিন রাত ৫ বার নামাজে বারবার বলছি।  বারবার!

মহাপ্রভু আমাদের সর্বোচ্চ সমর্পিত বান্দা হিসেবে কবুল করুন।সংক্ষিপ্ত কলেবরে নামাজ নিয়ে আজ এ অংশ পর্যন্ত লিখলাম।  নামাজের বাকী আরকান আহকামে কিভাবে লুকিয়ে আছে আল্লাহতে পূর্ণাঙ্গ সমর্পণের জীবন্ত বার্তা- ইনশায়াল্লাহ আমরা আগামী সংখ্যায় আলোচনা করবো।  আল্লাহ আমাদের সবাইকে সাহায্য করুন।  আপনাকে, আমাকে তাঁর কবুলকৃত দাস হিসেবে দয়া করে কবুল করুন।  আমীন। সেটিই তো হবে আমাদের সর্বোচ্চ পাওয়া।

I20150321221756

ইসলামে নারীর মর্যাদা

“নারী-পুরুষ মহান আল্লাহর সর্বোত্তম সৃষ্টি। আল্লাহ বলেন: “আমি মানব মণ্ডলীকে সর্বোত্তম আকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছি।” (সূরা আত তীন : ৪)

আল্লাহ তায়ালার এই সৃষ্টিতে কোন ধরনের পক্ষপাতিত্ব নেই; সবার জন্য সব কিছুই যথাযথ প্রদান করেছেন। যার যার কর্মস্থল নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আমাদের ডান এবং বাম চোখ দুটো আমাদের কাছে যেমন সমানভাবে প্রিয়, ঠিক তেমনি আল্লাহর কাছেও নারী-পুরুষ সমান। তিনি কোন পক্ষকেই আলাদা করে গুরুত্ব দেননি। তিনি পবিত্র কুরআনুল কারীমে বলেছেন :

“এতো আমার অনুগ্রহ, আমি বনী আদমকে মর্যাদা দিয়েছি এবং তাদেরকে জলে স্থলে সওয়ারী দান করেছি, তাদেরকে পাক-পবিত্র জিনিস থেকে রিযিক দিয়েছি এবং নিজের বহু সৃষ্টির ওপর তাদেরকে সুস্পষ্ট প্রাধান্য দিয়েছি।” (সূরা বনী ইসরাঈল : ৭০)

সুতরাং এ কথা খুবই স্পষ্ট যে, আল্লাহ তায়ালা দু’পক্ষকেই সমান মর্যাদা দিয়েছেন। এবং যার যার শারীরিক (Physical) সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ ভিন্ন দিয়েছেন, কিন্তু মর্যাদা কম দেননি। সুতরাং নারী-পুরুষের হিসাব যদি শুধু শক্তি আর দক্ষতার নিরীক্ষে হয়, আর মর্যাদার দিকটা উপেক্ষিত হয়, তাহলে এ পৃথিবীতে মানব সমাজে এত বেশি ভারসাম্যহীনতা দেখা দেবে যে তা ঠিক করা কারো পক্ষেই সম্ভব হবেনা।

 নারীদের ব্যাপারে ইসলামের মনোভাব :

১. মানুষ হিসেবে মর্যাদা

মহান আল্লাহ বলেন:

“হে মানব জাতি! তোমাদের রবকে ভয় করো। তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একটি প্রাণ থেকে। আর সেই একই প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন তার জোড়া। তারপর তাদের দুজনার থেকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। সেই আল্লাহকে ভয় করো যার দোহাই দিয়ে তোমরা পরস্পরের কাছ থেকে নিজেদের হক আদায় করে থাকো এবং আত্মীয়তা ও নিকট সম্পর্ক বিনষ্ট করা থেকে বিরত থাকো। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, আল্লাহ তোমাদের ওপর কড়া নজর রেখেছেন।” (সূরা আন নিসা : ১)

২. সম্মান এবং মর্যাদার ক্ষেত্রে

“এতো আমার অনুগ্রহ, আমি বনী আদমকে মর্যাদা দিয়েছি এবং তাদেরকে জলে স্থলে সওয়ারী দান করেছি, তাদেরকে পাক-পবিত্র জিনিস থেকে রিযিক দিয়েছি এবং নিজের বহু সৃষ্টির ওপর তাদেরকে সুস্পষ্ট প্রাধান্য দিয়েছি।” (সূরা বনী ইসরাঈল : ৭০)

৩. সম্পত্তির উত্তরাধিকার

এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“মা-বাপ ও আত্মীয় ¯স্বজনেরা যে ধন-সম্পত্তি রেখে গেছে তাতে পুরুষদের অংশ রয়েছে। আর মেয়েদের অংশ রয়েছে সেই ধন-সম্পত্তিতে, যা মা-বাপ ও আত্মীয়-স্বজনরা রেখে গেছে, তা সামান্য হোক বা বেশি এবং এ অংশ (আল্লাহর পক্ষ থেকে) নির্ধারিত।” (সূরা আন নিসা : ৭)

৪. শরিয়াত প্রদত্ত দায়িত্বের ক্ষেত্রে

“জবাবে তাদের রব বললেন: আমি তোমাদের কারো কর্মকাণ্ড নষ্ট করবো না। পুরুষ হও বা নারী, তোমরা সবাই একই জাতির অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা আলে ইমরান : ১৯৫)

৫. লেখা পড়ার অধিকার

এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) বলেন : (فعلمهن مما علمه الله تعالى) তাদের সেই শিক্ষা দাও যা আল্লাহ তায়ালা শিখিয়েছেন।” (সহীহ আল বুখারী)

৬. ধর্মীয় প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে মর্যাদা

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“হে লোকজন যারা ঈমান এনেছো, তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার ও সন্তান-সন্তুতিকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, মানুষ এবং পাথর হবে যার জ্বালানী। সেখানে রূঢ় ¯স্বভাব ও কঠোর হৃদয়ের ফেরেশতারা নিয়োজিত থাকবে যারা কখনো আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে না এবং তাদেরকে যে নির্দেশ দেয়া হয় তাই পালন করে।” (সূরা আত-তাহরীম : ৬)

৭. মেয়েদের জন্য উত্তম অসিয়ত করে যাওয়া

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“আমি মানুষকে এই মর্মে নির্দেশনা দিয়েছি যে, তারা যেন পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে। তার মা কষ্ট করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছিলো এবং কষ্ট করেই তাকে প্রসব করেছিলো। তাকে গর্ভে ধারণ ও দুধপান করাতে ত্রিশ মাস লেগেছে।” (সূরা আহকাফ : ১৫)

৮. স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সমান অধিকার 

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:

(وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِيْ عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوْفِ) “নারীদের জন্যও ঠিক তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে যেমন পুরুষদের অধিকার আছে তাদের ওপর।” (সূরা আল বাকারা : ২২৮)

উপরোক্ত সামান্য কয়েকটি প্রমাণ  উপস্থাপন করা হলো যা থেকে বুঝতে মোটেও কষ্ট হবার কথা নয় যে, নারীর ব্যাপারে ইসলামের মনোভাব কেমন।

 প্রাচীন সভ্যতা এবং ধর্মগুলো নারীদের ব্যাপারে কী মনোভাব দেখিয়েছে:

ইহুদী ধর্ম নারীকে ‘পুরুষের প্রতারক’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের সমাজের নারীদের চাকরানীর মত মনে করা হতো, পুরুষদের বর্তমানে নারী কোন সম্পত্তির মালিক হতে পারতনা, দ্বিতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারতনা। এরপর খ্রীষ্ট ধর্ম নারীদের ব্যাপারে নিকৃষ্টতম অবস্থান গ্রহণ করেছে। বাইবেল বলছে প্রথম পাপের সমস্ত দোষ মাতা হাওয়ার। সেখানে বলা হয়েছে “Adam was not deceived, but the woman being deceived, was in the transgression” তারা বলে যেহেতু নারী আদি পাপের উৎস, মানুষের জন্মগত পাপের কারণ, সব ভর্ৎসনা, অবজ্ঞা ও ঘৃণার পাত্রী সেই। এই নারী শয়তানের যন্ত্র (She is the organ of the Devil), কামড় দিবার জন্য সদা প্রস্তুত (A scorpion ever ready to sting), বিষাক্ত বোলতা (Poisonous asp)| হিন্দু ধর্মে এমনটা মনে করা হতো যে, আগুন, পানি, নিরেট মূর্খ, সাপ, রাজ পরিবার ও নারী এরা সবাই ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। এদের ব্যাপারে সাবধান হতে হবে। প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়েছে: মৃত্যু, নরক, বিষ, সর্প এবং আগুন এর কোনটিই নারী অপেক্ষা খারাপ নয়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মতে নারী হচ্ছে সকল অসৎ প্রলোভনের ফাঁদ। এর বর্ণনা দিয়ে ঐতিহাসিক Westermark বলেন: Women are, of all the snares which the temper has spread for man, the most dangerous; in women are embodied all the powers of infatuation which blind the mind of the world (মানুষের জন্য প্রলোভন যতগুলো ফাঁদ বিস্তার করে রেখেছে তন্মধ্যে নারীই সবচেয়ে বিপদজনক। নারীর মধ্যে মোহিনী শক্তি আবির্ভূত হয়ে আছে যা সমগ্র বিশ্বের মনকে অন্ধ করে দেয়)। Aristotle বলেন: man is by nature superior to the female and so the man should rule and the woman should be ruled.

বিভিন্ন সভ্যতায় নারীর মূল্যায়নের চিত্র আরও নীচ, হীন ও লজ্জাকর। যেমন: সপ্তাদশ শতাব্দীতে রোম নগরীতে নর সমাজ তাদের Council of the wise সভায় সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, “Women has no soul” “নারীর কোন আত্মা নেই”। গ্রীক সভ্যতায় মনে করা হতো ÒA commodity to be bought and sold”. ইন্ডিয়ার দীর্ঘ দিনের নিয়ম ছিল এমন “A wife’s life ended with the death of her husband, the widow has to jump into the flames of her husband’s funeral pyre”| ইসলাম পূর্ব আরব সভ্যতায় নারীর চিত্র ছিল “A woman was regarded as a cause for giref and unhappiness and baby girls were sometimes buried after birth”| ৫৮৭ সালে ফ্রান্সে এক সভার সভাষদগণ মহিলাদের মর্যাদা নিরূপনের সময় তাদের মত এভাবে প্রকাশ করেন “Whether a woman could truly be considered a human being or not!” এভাবে নারীদের তথা মাতা, কন্যা ও স্ত্রীর মর্যাদা চরমভাবে ভুলুণ্ঠিত হয়েছে সভ্যতার দাবিদার ইংল্যান্ডে। ৮ম হেনরি মেয়েদের বাইবেল পড়তে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। মধ্যযুগের ক্যাথলিক চার্চের গুরুগণ মহিলাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক মনে করত। আরও অবাক করার মত যে ঘটনা তা হচ্ছে ১৯৬৪ সালের আগে অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের সমান অধিকার ছিলনা। ১৮৫০ সালের পূর্ব পর্যন্ত মহিলারা ইংল্যান্ডের নাগরিক হিসেবে গণ্য হতো না, ১৮৮২ সালের আগে ইংলিশ মহিলাদের ব্যক্তিগত অধিকার বলে কিছু ছিলনা। (In the university of Oxford and Cambridge, male and female students were not given the same rights until 1964. Before 1850, women were not counted as citizens in England, and English women had no personal rights until 1882)

ইসলাম ধর্মে নারীদের যে অবস্থান, আর অন্যান্য প্রধান ধর্ম, সভ্যতা ও ব্যক্তিদের কথায় নারীদের যে চিত্র প্রতিভাত হলো তাতে নিঃসন্দেহে বলা যায় নারীর মর্যাদা প্রদানের ক্ষেত্রে ইসলামের কাছাকাছি কোন ধর্ম, ব্যক্তি ও সভ্যতা নেই। প্রাচীন ঐ সকল ধর্ম, সভ্যতা ও ব্যক্তিদের মূল্যায়ন যদি এমনই হবে তাহলে আর বুঝতে খুব বেশি বাকী থাকেনা যে, সংস্কৃতিতে তাদের মূল্যায়ন কেমন হবে।

সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নারীর মূল্যায়ন খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আমাদের সার্বিক কর্মকাণ্ডকে যদি সংস্কৃতি বলি আর সেখানে নারীকে মূল্যায়ন করতে হয় তাহলে বলতে হবে “কিছু বিপথগামী নারী ততোধিক নষ্ট এবং নোংরা মতলববাজ পুরুষের হাতে বন্দি”। এরা পুতুল নাচের মত পেছন থেকে নাচায়, আর নির্বোধ মেধাশূন্য শরীর সর্বস্ব নারী নাচে আর মনে করে নিজের সর্বোচ্চটা দিলাম আর পৃথিবীর সেরাটা পেলাম!! আসলে সব-ই ভোগাস! সাময়িক স্বার্থের লেনাদেনা মাত্র। আল্লাহ তায়ালা এবং আখেরাতের ব্যাপারে ভয়হীন মানুষগুলো নারীর সংস্কৃতির মূল্যায়ন যেভাবে নির্ধারণ করে তা হলো-

ক. নারী তোমাকে প্রগতিশীল হতে হবে; এই কথার মাঝে সে তাঁর ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, সে সকল কিছু শক্তি দিয়ে বিবেচনা করে, মর্যাদার স্থান একেবারে ভুলে যায়। নারী তখন সুন্দর সমাজের শৃঙ্খল ভেঙ্গে নিজেই অনেকের নোংরা খেলনায় পরিণত হয়।

খ. নারী তোমাকে স্মার্ট হতে হবে; তখন সে আল্লাহর দেয়া বিধানকে বাদ দিয়ে ফেরিওয়ালার ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করে, যার ফলে সে নিজেই পবিত্রতার শৃঙ্খল থেকে বের হয়ে ডাস্টবিনের দ্রব্যে পরিণত হয়।

গ. আবার তাকে বলা হয়, তোমাকে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে, তোমাকে উপার্জনক্ষম হতে হবে, ছেলে বন্ধুদের সাথে অবাধ চলাফেরা করতে হবে, পোশাকের বৃত্ত থেকে বের হতে হবে, নারী স্বাধীনতার আন্দোলন করতে হবে, নারী মুক্তি আন্দোলন করতে হবে এ জাতীয় বাক-চক্রে সে আচ্ছন্ন।

এ জাতীয় কর্মকাণ্ডের সূতিকাগার আমেরিকার মত সভ্যদেশের নারীদের অবস্থা কতটা ভয়াবহ তা নিচের রিপোর্টে অনুমেয়:

ফিউচার উইদাউট ভায়োল্যান্স নামে মার্কিন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পরিচালক লিসা জেমস বলেছেন, অল্পবয়সীরাই যৌন পীড়নের বেশি শিকার। পীড়নের শিকারদের মধ্যে ২৮ শতাংশ পুরুষ জানিয়েছে ১০ বছর বয়সের আগেই তারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। নারীদের বেলায় তা ১২ শতাংশ পীড়নের শিকারদের মধ্যে অর্ধেক ১৮ বছর বয়সে এবং ৮০ শতাংশ ২৫ বছর বয়সের আগেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তাদের ৩৫ শতাংশ পূর্ণ বয়স্ক হওয়ার পর পুনরায় যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের পরিচালক লিনডা ডিগটিস বলেছেন, নারীদের মধ্যে যৌন পীড়নের শিকার সংক্রান্ত প্রাপ্ত তথ্য রীতিমতো ভয়াবহ।

বাংলাদেশ অনুরূপ ভয়াবহতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যার সামান্য চিত্র গত ১১ মে ২০১৪ তারিখের দৈনিক ভোরের কাগজে পরিদৃষ্ট হয়-

– মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশের ৩০-৫০% নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার।

– বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর “Violence against women (VAW) survey 2011″ এর জরিপ অনুযায়ী দেশের অবিবাহিত নারীদের ৮৭% কোন না কোনভাবে নির্যাতনের শিকার, ৬৫% স্বামীর মাধ্যমে, ৩৬% যৌন নির্যাতন, ২৬% মানসিক নির্যাতনের শিকার।

– কর্মক্ষেত্রে ১৬% শারীরিক, ২৬% মানসিক আর ২৯% যৌন নির্যাতনের শিকার হন।

– আইন ও সালিশ কেন্দ্রের গত ৭ বছরের হিসাব অনুযায়ী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮৬৭ জন নারী। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ৩৮৫, ২০১২ সালে ৪৮২, ২০১০ সালে ৩৯৭, ২০০৯ সালে ২৮১, ২০০৮ এ ৩১২, ২০০৭ এবং ২০০৬ এ ২৮৩ এবং ৩০১ জন। এই হিসাবে আমরা কী দেখলাম! আমাদের নারী মুক্তি কিভাবে হবে? তাদের কোন মূল্যায়ন ও মর্যাদা আছে কি?

অপ্রিয় সত্য কথা হলো, যারা নারীদের নিয়ে এত কিছু করার ভাবনা দেখায়, তাদের হাতে নারীজাতি কতটা নিরাপদ? তাদের নোংরা- লোভাতুর দৃষ্টি থেকে কতটা মুক্ত নারীরা? তাদের মুক্তি কি ঐ সকল সভ্যতা ও ধর্মের আলোকে হবে, যারা নারীদেরকে অপমান করার আর কোন নিচু স্তর পায়নি? যারা সবসময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকে? যার কাছে ধর্মের কোন মূল্য নেই, পরকালের জবাবদিহিতার কোন চিন্তা নেই?

পাশ্চাত্যে যারা এই সকল নোংরা স্বাদ গ্রহণ করেছে তারা আজ আরও বিকল্প স্বাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আল্লাহর দেয়া প্রাকৃতিক নিয়ম উপেক্ষা করে দুনিয়ার তাবৎ প্রাণীকূল যা না করে, সৃষ্টির সেরা মানুষ তাতেই বল্গাহীনভাবে ছুটে চলেছে যার কারণে মরণব্যাধি এইডস, সিফিলিস- প্রমেহ, ক্যানসার এরকম অসংখ্য খারাপ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।

সুতরাং এই চরম ভঙ্গুর অবস্থা থেকে নিজে এবং নিজের জাতিকে বাঁচাবার জন্যে আল্লাহ তায়ালা এবং রাসূল (সা.) নির্দেশিত পথে চলা এবং সে অনুযায়ী রাষ্ট্র চালানোর চেষ্টা ব্যতিরেকে এ মহাব্যাধি কোনভাবেই নিরাময় হবেনা। এ প্রসঙ্গে ড. সাইরিল গার্বেটের উক্তিটি উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেন- “Only definite moral conviction based upon religious faith will give the necessary self-control”- “একমাত্র ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তিতে গঠিত সুনির্দিষ্ট দৃঢ় প্রত্যয়ই মানুষকে অনাচার হতে আত্মসংযমের শক্তি প্রদান করে।”

অতএব, পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ এবং ধর্মীয় অনুশাসনের মাঝেই যে নারী জাতির তথা সকল সমস্যার কাঙিক্ষত মুক্তি নিহিত সে বিষয়টি যত দ্রুত আমরা বুঝতে পারব এবং বাস্তবায়ন করব তত দ্রুত নারী জাতির প্রকৃত মূল্যায়ন আমরা করতে পারব।

parosparik somporrk

পারস্পরিক সম্পর্কের সৌন্দর্য ও সীমা

ইসলাম এক পরিপূর্ণ সামষ্টিক শক্তির নাম- যতখানি বাহ্যিক ততখানি আভ্যন্তরীন। আভ্যন্তরীণ এ শক্তিকে উখুয়াত বা ভ্রাতৃত্ব, ‘জামিয়া’ বা ঐক্যবদ্ধ এমন কিছু সুন্দর পরিভাষায় এ… করা হয়েছে।

“মুমিনরা পরস্পরের ভাই”। (হুজরাত-১০) পারস্পরিক সম্পর্কের এই ভিত্তি ইসলামী আন্দোলনের চরিত্রকে তুলে ধরে। এ কারণেই মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক এক ধরনের স্থিতি, গভীরতা ও ব্যাপকতা পেয়ে থাকে। কাদের সাথে সম্পর্ক তৈরি হবে, তার রূপ-ধরণ তথা সৌন্দর্য ও সীমা কেমন হবে এর পুরো নির্দেশনা আমরা আল্লাহর বাণী ও সীরাত হতে পেয়ে থাকি। মূলতঃ ইসলামের বিধি-বিধান, শরিয়ত নির্দেশনা বা আইন যাই বলা হোক না কেন সবক্ষেত্রেই আবেগ ও বাস্তবতার পূর্ণ মিলন ঘটেছে। যার পরিণতি স্বস্থি ও প্রশান্তির কারণ হয়ে থাকে। মুমিনদের সম্পর্ক কাদের ঘিরে তৈরি হবে তার নির্দেশনা কোরআনে এভাবেই এসেছে- “তোমাদের বন্ধু তো সত্যিকার অর্থে আল্লাহ তার রাসূল এবং ঐসব ঈমানদার যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং খোদার সামনে মাথা অবনতকারী।

এভাবেই ঈমানদাররা প্রকৃত বন্ধু বাছাই করবে। বন্ধুত্বের এ সম্পর্ক কোন বাহ্যিক সম্পর্ক নয়। দুনিয়াবী লেন-দেন, আদান-প্রদানে সীমাবদ্ধ নয়। এই সম্পর্ক আদর্শিক সম্পর্ক। তাই তার ধরনও ভিন্ন হয়ে থাকে- অনেক মজবুত এবং আল্লাহর রহমত দ্বারা পরিপূর্ণ।

“তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর এবং কখনো পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমরা তোমাদের উপর আল্লাহর নেই নেয়ামতের কথা স্মরণ করো যখন তোমরা একে অপরের দুশমন ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তাআলা (তার দ্বীনের বন্ধন দিয়ে) তোমাদেরকে একের জন্য অপরের অন্তরে ভালবাসা সঞ্চার করে দিলেন। অতঃপর তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহে “ভাই ভাই” হয়ে গেলে। অথচ তোমরা ছিলে অগ্নিকুণ্ডের প্রান্ত সীমানায়। অতঃপর সেখান থেকে আল্লাহ তাআলা তোমাদের উদ্ধার করলেন; আল্লাহ তাআলা এভাবেই তার নিদর্শনসমূহ তোমাদের কাছে স্পষ্ট করেন, যাতে করে তোমরা সঠিক পথের সন্ধান পাও।” (আলে ইমরান- ১০৩)

এই আদর্শিক সম্পর্ক ছাড়াও পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক মুমিনদের রক্ষা করতে হয়। ইসলাম তাকেও দ্বীনের সীমায় অন্তর্ভুক্ত করে আরো বেশি সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে। ইসলামী জীবন-বিধান যেহেতু এই সম্পর্ক ঘিরেই তৈরি তাই একে ইসলামের বুনিয়াদি কাজ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। পৃথিবীতে যে মানুষ আল্লাহকে বিশ্বাস করে না তাকেও এমন কিছু সম্পর্ক রক্ষা করতে হয়। তবে মুমিন ও দুনিয়াবী এ সম্পর্কের পার্থক্য হল হীরা ও কাঁচের মত। দুটি জিনিস সাদৃশ্য হলেও সমান হয় না।

পারস্পরিক সম্পর্কের সৌন্দর্য

মূলতঃ ইসলামে পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব, এর সৌন্দর্য ও সীমার মধ্যে নিহিত। তাই সম্পর্কের নির্দেশনা ও গুরুত্ব না বলে এর সৌন্দর্যের দিকটি তুলে ধরা হল। এ ব্যাপারে কোরআন হাদীসের নির্দেশনাই আমরা জানব।

ইনসাফের পূর্ণ প্রকাশ

শুধু সম্পর্ক রক্ষা করা নয় বরং পূর্ণ ইনসাফ সহকারে সম্পর্ক রক্ষা করা জরুরী। ইসলাম যেমন ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছে তার নমুনা অন্য কোন ব্যবস্থায় খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আল্লাহর নির্দেশ হলঃ

“আপনি বলুন, এসো আমি তোমাদেরকে তোমার প্রতিপালক যেসব জিনিস হারাম করেছেন তা পাঠ করে শুনাই। সেগুলো হচ্ছে আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করো না, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো, নিজ সন্তানদের অভাবের কারণে হত্যা করো না, আমি তোমাদেরকে এবং তাদের রিযিক দেই। প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতার কাছেও যেও না। যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন তাকে হত্যা করো না। তবে ন্যায়সঙ্গতভাবে করতে পারো। তোমাদের এ নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যেন তোমরা হৃদয়ঙ্গম করতে পারো। ইয়াতিমের সম্পদের কাছেও যেও না, তবে বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তম পন্থায় তাদের সম্পদ হেফাজত করা)। ন্যায় ও ইনসাফ সহকারে ওজন ও মাপ পূর্ণ কর। তোমাদেরকে আল্লাহ এ নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” (আন আম- ১৫২-১৫৩)

পিতামাতা ও সন্তানের প্রতি সুবিচার, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অন্যায়ের কাছে না যাওয়া, ন্যায় ও ইনসাফের কিছু নির্দেশ এখানে দেয়া হয়েছে। একটা মানুষ কিছু কিনতে গেলে যেমন সঠিক পরিমাপ করে আনে, তেমনি এখানে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইনসাফের ঠিক ঠিক পরিমাপ করা হয়েছে। এটাই ইসলামের সৌন্দর্য যা অনেক শক্তিশালীও হয়ে থাকে।

আবু জেহেল এক ইয়াতীমের সম্পত্তি আ্তসাৎ করায় ছেলেটি আল্লাহর রাসূলের কাছে বিচার নিয়ে আসে। তিনি সেই ছেলেটিকে নিয়ে আবু জেহেলের কাছে যান এবং সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে বলেন। কোন প্রতিবাদ ছাড়াই দ্রুত সে তা ফিরিয়ে দেয়। এতে আবু জেহেলের সাথীরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে- “কেন সে এভাবে মুহাম্মাদের কথা মেনে নিল। আবু জেহেল বলল, “আমার মনে হচ্ছিল মুহাম্মাদের দুই পাশে বিশাল ভয়ঙ্কর দুটি সাপ আমাকে খেয়ে ফেলবে। তাই দ্রুত সম্পদগুলো ফিরিয়ে দিলাম।”

হাদীসে দু’সন্তানের মধ্যে একজনের চাইতে আর এক জনকে বেশি ভালবাসতেও নিষেধ করা হয়েছে। পিতা-মাতা, প্রতিবেশি, আ্তীয়, মুমিন ভাই- এমন প্রতিটা সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেখানে ইনসাফের কোন কমতি নেই। আবার কেউ যদি এ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইনসাফ নষ্ট করে তবে শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে মাফ চাইলেই তিনি মাফ করবেন না। বরং সংশ্লিস্ট ব্যক্তি যদি মাফ করেন তবেই তিনি মাফ করবেন।

পারস্পরিক ভালবাসা যেমন থাকতে হবে, ইনসাফও থাকতে হবে। অন্যকে বঞ্চিত করে নিজের আপনজন বলেই কাউকে প্রাধান্য দেয়া যাবে না। আমার সাথে অন্যায় হয়েছে বলে কারো সাথে অন্যায় করা বা আমাকে অধিকার হতে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে তার প্রতি আমি দায়িত্ব পালন করব না- এটা ইসলামের সৌন্দর্যের বহির্ভূত। যে বুড়ি আল্লাহর রাসূলের পথে প্রতিদিন কাঁটা দিত তিনি তার অসুস্থতায় তাকে দেখতে যান। যারা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করে তিনি সে সময়ও তাদের আমানত ফিরিয়ে দিয়ে যান। এ কারণেই কাফেররা যুদ্ধের ময়দানে এ ….. বিরুদ্ধে তারা অস্ত্র ধারণ করছে?” এমন চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকে এবং যুদ্ধের ফলাফলের পূর্বেই নৈতিকভাবে পরাজয়বরণ করে।

সঠিক ভারসাম্যপূর্ণ মানদণ্ড প্রদান

ইসলামে পারস্পরিক সম্পর্কের আর একটি দিক হল সঠিক মানদণ্ড প্রদান। যেন তা সমাজে যথাযথ ভারসাম্য রক্ষা করে। মানুষ এর মাধ্যমে সহজেই বুঝতে পারে তার আচরণ ঠিক হল কিনা।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (সঃ) বলেন, তোমাদের কেউ সেই পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যে পর্যন্ত না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তা নিজের ভাইয়ের জন্যও পছন্দ করে। (বোখারী ও মুসলিম)

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (সঃ) বলেছেন, তোমরা পরস্পর হিংসা বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অপরের দামের মূল্য বৃদ্ধি করো না; ঘৃণা ও বৈরীভাব পোষণ করো না, শত্রুতা করো না, একজন আর একজনের বিক্রির উপর বিক্রি করো না, তোমরা আল্লাহর বান্দারা ভাই হয়ে যাও। মুসলমান, মুসলমানের ভাই। এক মুসলিম ভাই আর এক মুসলিম ভাইয়ের উপর যুলুম করো না। অন্য ভাইকে ঘৃণা ও লাঞ্ছিত করবে না। তাকওয়া হচ্ছে এখানে, একথা বলে তিনি তিনবার ইঙ্গিত করেন। কোন মুসলমান ভাইয়ের খারাপ হওয়ার জন্য অন্য মুসলমান ভাইকে ঘৃণা করাই যথেষ্ট। সকল মুসলমানের জন্য অপর মুসলমান ভাইয়ের জান-মাল ও ইজ্জত হারাম করা হয়েছে।” (মুসলিম)

অদ্ভুত সুন্দর দুটি মানদণ্ড এখানে রয়েছে,

প্রথমতঃ নিজের জন্য যেমন চাইব, অন্যের জন্যও তা চাইতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ তাকওয়া অর্থাৎ আল্লাহর ভয় সহকারে এ সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে।

একটা বাচ্চা কিংবা একজন পূর্ণবয়স্ক শিক্ষিত লোক যাকেই বলা হোকনা কেন, যদি পছন্দ করতে বলা হয় তবে তুলনামূলক ভাল জিনিসটি নিজের জন্য পছন্দ করবে। এটাই বর্তমান সমাজের স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু ইসলামের মানদণ্ড তা হতে ভিন্ন। আমি একজন বোন হিসেবে যা পেতে চাই আমার বোনকেও তাই দেব। প্রতিবেশি হিসেবে যেমন আশা করি, আমার প্রতিবেশির প্রতিও তেমন হব। আমার মুমিন ভাইয়ের প্রতি যা কামনা করব, তাদের প্রতিও তেমন হব এটাই ইসলামের বিধান। আর এর সাথে সমন্বয় থাকতে হবে তাকওয়া। তাকওয়া এই মানদণ্ডকে সৌন্দর্য প্রদান করে। তাইতো আবু তালহা (রাঃ)র ঘরে যখন মাত্র একজনের খাবার ছিল, তিনি নিজের বাচ্চাদের না খাইয়ে, নিজে না খেয়ে অভাবী মুসাফিরকে খাবার প্রদানকে প্রাধান্য দেন। আয়েশা (রাঃ) দুহাত ভরে দান করে ঘরে এসে দেখেন ইফতারের জন্য কিছুই নেই। এর চাইতে সর্বোত্তম মানদণ্ড আর কি হতে পারে।

মানবিকতার বিকাশ

কিছুদিন আগেও টিভিতে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কিছু বিজ্ঞাপন দেখা যেত (একটি পত্রিকার) যেখানে বাসে মহিলা সীট খালি করতে বলা হলে কটুক্তি করা হয়। এমন অনেক দৃশ্যই আমরা দেখে থাকি। পারস্পরিক মতবিরোধের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করা, কথা না বলা, রাগের বসে অধীনদের সাথে খারাপ ব্যবহার আরো কতোকিছু। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানবিক অবস্থানের বিকাশ ঘটায়। যেখানে এসবের কোন সুযোগ নেই।

সা’দ আহমদ এবং অন্যান্যরা আবদুল্লাহ ইবনে রফি হতে বর্ণনা করেন, “তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান (রাঃ) রাতে নিজেই ওযুর পানি তুলতেন। যখন তাকে বলা হল আপনি চাকরদের দিয়ে পানি সংগ্রহ করলেই তো হতো। তিনি উত্তরে বললেন না, রাত তাদের জন্য এখন তারা বিশ্রাম নেবে।

হযরত আবু বকর (রাঃ) খলিফা হবার আগে পশুর দুধ দোহন করতেন। খলিফা হিসেবে বাইয়াত গ্রহণের পর একটি মেয়ে বলল, এখন আর আমার দুগ্ধবতী পশু দোহন করা হবেনা। হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন, শপথ করে বলছি আমি তোমার দুধ দোহন করতে হবে। আগে আমি মানুষের যে সেবা করেছি, খলিফা হওয়ার পর তাতে কোন পরিবর্তন হবেনা।

এমন মানবিকতা ইসলামে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিকাশ ঘটায় যা অন্য কোন পদ্ধতিতে বা সচেতনতামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আমরা হয়ত আন্দোলনের কর্মী হিসেবে সম্পর্ক ছিন্ন করি না। কিন্তু নিজের অনেক ব্যস্ততার ও অন্যের প্রয়োজন খেয়াল রাখা কিংবা নিজে কষ্ট স্বীকার করে অন্যের সুবিধা করে দেয়ার মত সম্পর্কের চিত্র খুব কমই দেখা যায়। এমন মানবিকতাই ইসলামে কাম্য। আল্লাহরই দান এবং তা কোন কিছু দিয়ে কেনা যায়না।

“আল্লাহ তাদের অন্তরে ভালবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন আপনি যদি জমীনে যা সম্পদ আছে, সব কিছু খরচ করতেন তথাপি তাদের মধ্যে ভালবাসা সৃষ্টি করতে পারবেন না। কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে ভালবাসা সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই তিনি পরাক্রমশালী ও বিজ্ঞ।” (সূরা আনফাল- ৬৩)

বাহ্যিক অভ্যন্তরীণ উভয় দুর্বলতা ত্রুটি সংশোধন

পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুটো দিকই মানুষের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেমন অভ্যন্তরীণ দিক হিসেবে- বেশি বেশি অনুমান করা, হিংসা, অংহকার, রাগ ইত্যাদি প্রতিটি বিষয়ে কোরআন ও হাদীসে সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। প্রকাশ্যভাবে মানুষ কথা দিয়ে অন্যের প্রতি যে অন্যায় করে যেমন গীবত করা, ওয়াদা ভঙ্গ করা, অভিশাপ দেয়া, মিথ্যা বলা ইত্যাদির প্রতিও কঠোর নির্দেশনা এসেছে।

আবার বিভিন্ন কার্যক্রম ও আচরণের মাধ্যমেও অন্যায় হবার সম্ভাবনা থাকে। যেমনঃ যুলুম করা, ধোঁকা দেয়া, অধিকার নষ্ট করা, কষ্ট দেয়া, মুনাফেকী আচরণ, আ্তসাৎ, অপবাদ দেয়া ইত্যাদি। ইসলাম প্রতিটা বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার হুকুম দিয়েছে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে-

“আর আমি আদেশ করছি যে আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী শাসন করুন ও ফায়সালা দিন। তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকুন যেন তারা আপনাকে এমন কোন নির্দেশ হতে বিচ্যুত না করে যা আল্লাহ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন। তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে জেনে রাখুন, আল্লাহ তাদেরকে তাদের গুনাহের শাস্তি দিতেই চেয়েছেন, মানুষের মধ্যে অনেকেই নাফরমান আছে।” (মায়িদা- ৪৯)

সুতরাং লক্ষ্য রাখতে হবে, আমার বোনের প্রতিটা বিষয় আমার জন্য আমানত। কখনো কারো প্রতি বিরক্ত হয়ে তার সম্পর্কে খারাপ অনুমান যেন চলে না আসে। একটা মানুষের কিছু দোষ সমাজে ছড়িয়ে পড়বে এমন পরিবেশ তৈরি করা যাবে না বরং গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে আল্লাহর জন্য। সামষ্টিক পরিবেশের ত্রুটিগুলো আমাকে পিছিয়ে দেবে না বরং তার সংশোধনকারী হিসেবে আমি সামনে আগাবো। কারো মতের সাথে আমার মিল না হলেও সুবিধা পাবে এবং অন্যের সাথে বিরোধ হলেও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে হয় এমনই ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আচরণ হতে হবে।

সুস্থ সংস্কৃতি-শিষ্টাচারের বিকাশ সাধন

ইসলাম সামাজিক পরিবেশে এমন কিছু সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা তৈরি করে দিয়েছে যা শিষ্টাচারের সর্বোত্তম নমুনা। বর্তমান পরিবেশে বড় পরিচার বা যৌথ পরিবারে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখা কষ্টকর হয়ে যায়। মানুষ মেহমানদারিতে বেশ বিরক্ত থাকে, পিতা-মাতা বৃদ্ধ অবস্থায় নিজেকে অসহায় মনে করে। নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকাই মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড়দের কথার উপর জবাব দেয়া স্বাবাভিক বিষয় হয়ে গেছে। এমনকি নিশ্চিন্তে কেউ কারো কাছে সাহায্যের জন্য দাবী করার সাহস পর্যন্ত পায় না। এর বিপরীতে ইসলামের স্বরুপ হলঃ

“তাদের দ’জনের (পিতা-মাতার) জন্য দয়া ও বিনয়ের বাহু অবনত করো। (বনী ইসরাইল- ২৪)

বিরক্তির প্রকাশ “উহ” শব্দটা পর্যন্ত করা যাবে না। তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করতে বলা হয়েছে।

উম্মু কুলসুম বিনতে ওকবা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ উত্তম দান-সাদকাহ হচ্ছে, মনে শত্রুতা পোষণকারী আ্তীয়ের প্রতি দান করা।” (তাবরানি, ইবনু মাজাহ)

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে সে যেন নিজ প্রতিবেশিকে কষ্ট না দেয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে সে যেন নিজ মেহমানের সম্মান করে এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন কথা বললে ভাল কথা বলে, নতুবা চুপ থাকে। (বোখারী ও মুসলিম)

প্রতিবেশিকে দেয়ার জন্য তরকারীতে ঝোলও বেশি করে দিতে বলা হয়েছে। এমন সব সুন্দর সমাজ ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হওয়াই ইসলামের শিক্ষা।

আমরা বিভিন্ন পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে উঠি। হয়ত কারো প্রতি দাবী অনেক বেশি থাকে আবার কারোর প্রতি কম থাকে। কিন্তু আল্লাহর একজন কর্মী সব সময় তার মানদণ্ড বজায় রাখবে, বিশ্রামপ্রিয় হওয়া, সম্পর্কের দাবী পূরণের উদাসীন হওয়া, প্রয়োজন না থাকলে পরিবারের কাজে সময় না দেয়া। ভাইবোন, আ্তীয়ের প্রতি কম দায়-দায়িত্ববোধ সম্পন্ন হওয়া, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা, অন্যান্য দ্বীনি বোনের প্রয়োজন ও অসুবিধাকে বুঝতে না পারা বা খেয়াল না করা- এমন আচরণ হতে বিরত থাকতে হবে।

ইমাম মা…… বলেছেন, ইমাম আহমদ বিন হাম্বাল তার ভাইকে ও যারা বড় তাদের খুব সম্মান করতেন। একবার তার কাছে আবু হাম্মাম গাধায় আরোহন করে আসেন এবং তিনি গাধার লাগাম ধরে তাকে নামান। তিনি তার চাইতে বড় অন্যান্যদের সাথেও এমন আচরণ করতেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে কোন শিষ্টাচার শরীয়তের নীতির পরিপন্থি যেন না হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েই তার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। সমাজ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। বিভিন্ন আইন হয়েছে। সংসদে সম্প্রতি একটি আইনও পাশ হয় যেখানে বলা হয় বৃদ্ধ পিতামাতার এমন সম্পর্ক তৈরি করতে পারেনি।

প্রয়োজন মর্যাদা সংরক্ষণ

ভরণ-পোষণের দায়িত্ব সন্তানকে নিতে হবে।

পারস্পরিক সম্পর্কের মর্যাদা সংরক্ষণ ও প্রয়োজন পূরণ ইসলামী জীবনবোধে এর একটি অসাধারণ দিক। সামষ্টিক কোন তৎপরতার এটা এতটাই জরুরী যে অনেক সুন্দর লক্ষ, উপযুক্ত কর্মসূচী ও প্রয়োজনীয় উপায় উপকরণ থাকলেও এর অভাবে তা ভেঙ্গে পড়ে। আবার একটি সামাজিক পরিবেশও বিশৃক্মখল হয়ে উঠে এর অভাবে। এ ধরনের বিষয়ের প্রতি ইসলামের নির্দেশনা খুবই সচেতনতামূলক ও গুরুত্ববহনকারী। এ ক্ষেত্রে সূরা হুজরাতের কিছু আয়াত তুলে ধরলে আমরা ইসলামের সৌন্দর্যের এ দিকটা বুঝতে পারব।

“হে  নবী! যেসব লোক তোমাকে হুজরাগুলির বাহির হতে ডাকাডাকি করে তাদের মধ্যে অধিাকাংশই নির্বোধ। তোমার বের হয়ে আসা পর্যন্ত তারা যদি ধৈর্য্য ধারণ করত তবে তা তাদের জন্যই ভালো ছিল। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল ও করুণাময়। (হুজরাত- ৪-৫)

“হে ঈমানদার লোকেরা! না কোন পুরুষ অপর পুরুষের বিদ্রুপ করবে- হতে পারে সে তাদের তুলনায় ভালো। আর না কোন মহিলা অন্য মহিলাদের বিদ্রুপ করবে, হতে পারে সে তাদের অপেক্ষা উত্তম। (তোমরা) নিজেদের মধ্যে একজন অপরজনকে অভিশাপ দিবে না এবং খারাপ নামে ডাকবে না। ঈমান গ্রহণের পর ফাসেকী কাজে লিপ্ত হওয়া খারাপ কাজ। যারা এমন আচরণ থেকে বিরত না থাকলে তারাই জালেম। (হুজরাত- ১০)

“আল্লাহ মন্দ কথা প্রকাশ করা ভালবাসেন না। তবে কারো উপরে জুলুম করা হয়ে থাকলে (অন্য) কথা। জেনে রেখো আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও জানেন। (সূরা নিসা- ১৪৮)

এভাবে অন্যের প্রয়োজন পূরণ ও মর্যাদা সংরক্ষণের বিষয়ে বলা হয়েছে। কারো দুর্বলতা প্রকাশ না করার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের কোন কথা বা আচরণ দ্বারা যেন কেউ কষ্ট না পায়। কারো ভুলত্রুটি প্রকাশ পেয়ে গেলেও নমনীয় থাকতে হবে। তবে ইসলামে মৌলিক বিধানে কোন ছাড় দেয়া যাবেনা। কারো চাইতে কাউকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে এমন কিছু যেনো আচরণ প্রকাশ না পায়। প্রত্যেকের মতামত ও চিন্তা আমার কাছে গুরুত্ব পাবে যদিও তার সব সময় সবটা গ্রহণ নাও করা সম্ভব হয়। অন্যের প্রতি সহনশীলতা বজায় রাখা এমনকি বিতর্কের ক্ষেত্রেও। পারস্পরিক প্রয়োজন বুঝতে পারলে এবং মর্যাদা সংরক্ষণ করতে পারলে অনেক ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তি সংশোধন হয়ে যেতে পারে। এটা সামাজিক রুচিবোধের প্রকাশ।

কল্যাণকর কাজের বিস্তার লাভ

পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে কল্যাণকর তৎপরতা ও অভ্যাস বিস্তার লাভ করা এক ধরনের সৌন্দর্য।

আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসূল (সঃ) বলেছেন, এক মুসলমানের প্রতি অপর মুসলমানের ছয়টি হক রয়েছে। ১. কোন মুসলিম অসুস্থ হয়ে পড়লে সেবা করা। ২. মৃত্যুবরণ করলে দাফন কাফনে উপস্থিত হওয়া ৩. দাওয়াত দিলে গ্রহণ করা ৪. সাক্ষাত হলে সালাম দেয়া ৫. হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলা ৬. উপস্থিত বা অনুপস্থিত সকল অবস্থায় মঙ্গল কামনা করা। (নাসায়ী, বুখারী)

এসব বিষয় অভ্যন্তরীণ মজবুতী তৈরি ও কল্যাণকামী হবার জন্য দরকার আমার কোন বোন অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া ও সেবা করা, আমার প্রতি তার হক, পরস্পর পরস্পরের প্রতি দোআ করা, সুখের সময় ও বিপদের সময় পাশে থাকা আমার দায়-দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। ইসলাম কখনই আ্তকেন্দ্রিকতাকে সমর্থন করে না। আমাদের সম্পর্ক শুধু “ফরমাল” সম্পর্ক হবে না এখানে সেটাই বুঝানো হয়েছে। এছাড়া শুধু সম্পর্ক রক্ষায় ইসলামের কোন সৌন্দর্য নেই।

ব্যক্তিত্ব আবেগের প্রকাশ

আল্লাহর জন্য যে সম্পর্ক সেখানে ব্যক্তিত্ব ও আবেগের সঠিক অবস্থান থাকতে হবে। অন্যরা তার সাথে মেলামেশা করলেই তা বুঝতে পারবে। মুমিন অহেতুক কথা বলা, বিতর্ক করা, কুটিলতা ও জটিলতা থাকবে, আবার নিজ ভাইয়ের প্রতি ভালবাসার বহিঃপ্রকাশও থাকবে তার আচরণে।

“রহমানের আসল বান্দাতো তারাই যারা জমীনে বিনয়ের সাথে চলে। আর জাহেল লোকের তাদের সাথে কথা বলতে আসলে তারা বলে, তোমাদেরকে সালাম। (ফুরকান- ৬৩)

“(রহমানের বান্দাতো তারাই) যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না, আর অর্থহীন কোন বিষয়ের নিকট দিয়ে অতিক্রমকালে শরীফ মানুষেরা তা এড়িয়ে চলে।” (সূরা আল ফুরকান- ৭৪)

মুমিনদের আচরণ ভারসাম্যপূর্ণ আবেগও থাকবে। রাসূল (সঃ) একবার মসজিদের ভিতর বসেছিলেন। সেখানে একজন লোক আসলে তিনি নড়েচড়ে বসেন। তিনি বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ যথেষ্ট জায়গা আছে,” তিনি বললেন “মুসলমানের হক হচ্ছে এই যে তার ভাই যখন তাকে দেখবে তার জন্য সক্রিয় হয়ে উঠবে।” (বায়হাকী)

যায়িদ ইবনে হারিস (রাঃ) যখন মদিনা হতে আসেন তখন রাসূল (সঃ) চাদর না পরে তা টানতে টানতে দ্রুত দরজায় চলে আসেন তাকে মোলাকাত করার জন্য। আবার জাফর তাইমিয়া (রাঃ) আবিসিনিয়া হতে আসলে রাসূল (সঃ) তাকে জড়িয়ে ধরেন। আবেগের এমন সমন্বয় ইসলামী আন্দোলনের সফলতার মূলমন্ত্র।

নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা

এখানে প্রত্যেকেই পরস্পরের ব্যাপারে নিজেকে নিরাপদ মনে করবে। অধিকারের ব্যাপারে যেমন নিরাপদ থাকবে তেমনি হক আদায়ের ব্যাপারেও। কেউ আমাকে গোপন বিষয় বলে এতটুকু যেন নিরাপদ থাকতে পারে যে, তার গোপন বিষয়ের আমানতদার পাবে। এখানে ইয়াতিম তার সম্পদের জন্য নিরাপদ থাকবে, মজুরও নিশ্চিন্ত থাকবে তার মজুরীর ব্যাপারে। পিতা-মাতাও বৃদ্ধাবস্থায় নিজের অবস্থানকে অনিশ্চিত মনে করবে না।

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূল (সঃ) বলেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোন মোমিন মুসলমানদের একটি বিপদ দূর করে আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার একটি বিপদ দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোন দুঃখির দুঃখ কষ্ট দূর করে, আল্লাহ তার দুনিয়া ও পরকালের দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ-ত্রুটি গোপন করে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষত্রুটি গোপন রাখবেন। আল্লাহ বান্দাকে সেই পর্যন্ত সাহায্য করতে থাকেন, যে পর্যন্ত বান্দা নিজ ভাইয়ের সাহায্য করে।” (মুসলিম)

এভাবেই মুসলমানদের ভিতর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রত্যেক প্রত্যেকের প্রতি নিশ্চিন্ত থাকতে পারে।

অধিকার দায়-দায়িত্বকে অনুগ্রহ হতে আলাদা …. হয়েছে

আল্লাহর কোরআন ও হাদীসের যেখানেই নির্দেশনা এসেছে সেখানেই একে হক রক্ষা করা, ইবাদাত বা সদকাহ বলা হয়েছে। পিতা-মাতা, আ্তীয়, প্রতিবেশি প্রত্যেকের অধিকার রক্ষা করাই হক। ভাল কথা, আচরণ ও কল্যাণের কাজসমূহই সদকাহ। প্রতিটা ভাল কাজই ইবাদত। সুতরাং পারস্পরিক সম্পর্কের এ বিষয়গুলোকে মানুষ তার নিজের অনুগ্রহ বলতে পারবে না।

“আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই (আল্লাহর) মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম মিসকীন মুসাফির, ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসের জন্য। (সূরা বাকারা- ১৭৭)

“যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণ করে, তারা নিজ পেটসমূহে আগুন হজম করে এবং শিঘ্রই তারা দোযখে প্রবেশ করবে।” (সূরা নিসা- ১০)

বনী ইসরাইলে বলা হয়েছে- “আপনি বলুন, হে রব! তারা আমাকে ছোটকালে যেভাবে লালন-পালন করেছে অনুরূপভাবে আপনিও তাদের দু’জনের উপর রহম করুন।”

সুতরাং যারা অসহায়ের জন্য ও যারা সাহায্য প্রার্থী তাদের জন্য এগিয়ে আসাকে কর্তব্য বলা হয়েছে, অনুগ্রহ নয়। এভাবে ইসলাম পারস্পরিক সম্পর্ক আরো বেশি সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে।

পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষার সীমা:কিছু সীমাও আল্লাহপাক নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

বুনিয়াদী আদর্শ সংরক্ষণ

মানুষ প্রতিটা সম্পর্ক আল্লাহর জন্যই গড়ে তুলবে। তাই এই সম্পর্ক ততক্ষণ পর্যন্ত সংরক্ষিত হবে যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ এর মাধ্যমে আল্লাহকে সন্তুষ্টি করবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ

“(এরা সেসব লোক) যারা আল্লাহর সাথে (আনুগত্যের) চুক্তি মেনে চলে এবং কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে না এবং আল্লাহ তাআলা যেসব মানবীয় সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে বলেছেন তা অক্ষুণ্ন রেখে চলে, যারা নিজেদের মালিককে ভয় করে।” (সূরা আর রাদ- ২০)

“পিতামাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়ে শরীক করতে বলে যার জ্ঞান তোমার নাই, তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তার সাথে সদ্ব্যবহার কর। যে আমার দিকে প্রত্যাবর্তন করে তার পথ অনুসরণ করো। (সূরা লোকমান- ১৫)

একবার আবু যার (রাঃ)কে উদ্দেশ্য করে মুহাম্মদ (সঃ) প্রশ্ন করলেন- হে আবু জার ঈমানের কোন কাজটি অধিকতর মজবুত। জবাব দিলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। মহানবী (সঃ) বললেনঃ তা হচ্ছে আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব এবং তার জন্য ভালবাসা ও শত্রুতা।” (বায়হাকী- ইবনে আব্বাস)

মুমিনদের সম্পর্ক কোন ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়। প্রতিটা সম্পর্ক আল্লাহর জন্য। তাই তা সংরক্ষণে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা যাবে না। ব্যক্তির প্রতি সম্পর্ক এতখানি থাকা যাবে না যে, তার অনুপস্থিতিতে আল্লাহর পথে আমার টিকে থাকার উপর বিরূপ প্রভাব তৈরি করবে বরং সবকিছুই আল্লাহর জন্য হতে হবে।

সীমা লংঘন না করা

“পৃথিবীতে দাম্ভিকতা সহকারে চলো না। নিশ্চয়ই তুমি ভূপৃষ্ঠে বিদীর্ণ করতে পারবে না। এবং উচ্চতায় পর্বত প্রমাণ হতে পারবে না। এসবের মধ্যে যেগুলো মন্দ কাজ, সেগুলো তোমার রবের কাছে অপছন্দনীয়।” (বনী ইসরাইল- ৩৭-৩৮)

রাগ, অহংকার, বাড়াবাড়ি করাকে নিষেধ করা হয়েছে। পৃথিবীতে চলাফেরার ক্ষেত্রেও পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষায় অনেক বেশি নম্রতা Aej¤^b করতে হবে। আল্লাহর রাসূলের এটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল নম্রতা। এ কারণে তার … পরত। চারপাশে লোক সমাগম হত। নয়ত তার চারপাশে হতে তাই আচরণের ক্ষেত্রে সীমা লংঘন হতে সাবধান হতে হবে।

প্রতিদান প্রশান্তিতে সীমা রক্ষা করা

প্রতিদান শুধু আল্লাহর নিকট চাইতে হবে। প্রতিদানের আশায় অনুগ্রহ করতে আল্লাহ কোরআনে নিষেধ করেছেন। নবী-রাসূলগণ যখনই মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান জানিয়েছেন প্রক্যেকেই বলেছেন যে, কোন প্রতিদান বা বিনিময় তারা চান না। তাই আল্লাহর জন্যই যে সম্পর্ক দুনিয়াতে তার প্রতিদান কামনা না করে আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে। এমনকি কৃতজ্ঞতা পর্যন্ত আশা করা যাবে না।

পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের সৌন্দর্য ও সীমা ইসলামের জীবন বোধকে পরিপূর্ণতা দেয় এবং সফলতার প্রান্তসীমা দান করে। এর দৃষ্টান্ত অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। যুদ্ধের ময়দানে একজন মুমূর্ষূ ব্যক্তির কাছে পানি নিয়ে আসা হলে আর এক ব্যক্তি পানির জন্য আর্তনাদ করে উঠে। প্রথম ব্যক্তি দ্বিতীয় ব্যক্তিকে আগে পানি দিতে বললেন, কিন্তু তার কাছে পানি নিয়ে গেলে আর এক ব্যক্তি আর্তনাদ করে উঠে সুতরাং দ্বিতীয় ব্যক্তিটা ঐ ব্যক্তিকে পানি দিতে বললেন। এভাবে ষষ্ঠ জনের কাছে যাওয়া হল কিন্তু ততক্ষণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এভাবে প্রথম ব্যক্তি পর্যন্ত আসতে আসতে দেখা গেল প্রত্যেকেই মৃত্যুবরণ করেছে। সুবহানাল্লাহ কিন্তু অসাধারণ দৃষ্টান্ত ঈমানদারদের রয়েছে যারা আল্লাহর জন্যই অন্যকে অগ্রাধিকার দান করে। এজ্যনই আল্লাহ এই সম্পর্ককে নেয়ামত বলেছেন। আল্লাহর নবী মুমিনদের এভাবে সাবধান করেছেন।

“মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর কায়েম থাকে। কাজেই তোমরা কাকে বন্ধু বানাও তা প্রক্যেকেই ভেবে চিন্তে নাও।

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত মুমিনদের এ সম্পর্ক আতরের মত যার সুগন্ধ দূর-দূরান্ত হতে পাওয়া যায় এবং যেখানে স্পর্শ করে তাই সুগন্ধিতে ভরে যায়।

ইউসুফ (আঃ) তাই এভাবেই দোআ করেছেন “আমাকে মুসলিম থাকা অবস্থায় মৃত্যু দাও এবং আমাকে সালেহীনদের মধ্যে শামিল করাও।” (ইউসুফ- ১০১)

doinondin jibone islam

দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম

মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব হল চরিত্রে। উন্নত নৈতিক চরিত্র সম্পন্ন করার জন্য রাসূল (সঃ) কে প্রেরণ করা হয়েছে। তাই আমাদের প্রতিটি কাজ আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ মত হতে হবে। একজন মুসলিম তার দৈনন্দিন জীবনে ইসলামের মৌলিক নির্দেশ তথা ফরজ-ওয়াজিব, হালাল-হারামগুলো অবশ্যই নিষ্ঠার সাথে পালন করবে।

প্রাত্যহিক জীবন পরিচালনায় যা মেনে চলবে তা হল :

আল্লাহর অনুগত হওয়াঃ

একজন মুসলমানের প্রাত্যহিক জীবনের শুরুই হবে সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্যের স্বীকৃতির  মাধ্যমে। দৈনন্দিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মানুষকে অশ্লীল ও খারাপ কাজ হতে বিরত রাখে। রাসূল (সঃ) বলেছেন-

“নামাজ দ্বীন ইসলামের ভিত্তি। যারা নামাজ কায়েম করে তারা দ্বীনকেই কায়েম রাখে, আর যারা নামায ছেড়ে দেয় তারা দ্বীনের ভিত্তি চূর্ণ করে দেয়।”

রাসূল (সা) আরও বলেন-

“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দেয় সে কুফরী করে।”

মূলত নামাজের মাধ্যমে একজন মুসলমান রুকু সিজদা, কেয়াম, তসবীহ, কেরাত ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে এ ওয়াদা করে যে দুনিয়াতে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলবে এবং খোদার নাফরমানি সে করবে না।

বান্দা আল্লাহর কাছে এ ওয়াদা ও চুক্তি করে থাকে ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, দ্বিপ্রহরের সামান্য পরেই, কর্মব্যস্ত বিকাল বেলা সূর্যাস্তের পরপরই এবং রাত্রির কিছু অংশ পার হয়ে গেলে।

এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি এভাবে পরিশুদ্ধ হয় যার কথা রাসূলের হাদীসের মাধ্যমে জানা যায়। রাসূল (সাঃ) বলেন-

“ তোমাদের কারোর বাড়ির নিকটে যদি নদী থাকে, আর সে যদি তাতে দৈনিক পাঁচ বার গোসল করে তাহলে তার গায়ে ময়লা থাকতে পারে কি? সাহাবাগণ বলেন, “ না কখনই থাকতে পারে না।” রাসূল (সাঃ) পুনরায় বললেন ঠিক এভাবে যে ব্যক্তি দৈনিক পাঁচবার ঠিকমত নামায আদায় করে তার মধ্যে কোন গুনাহ থাকতে পারে না।”

কাজেই নামাযের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির সাথে শুধু আল্লাহর সম্পর্কই তৈরি হয় না বরং ব্যক্তি জীবনকে পাক, পবিত্র ও দোষমুক্ত করে তোলে। তাই নামাযের মাধ্যমে হবে দিনের শুরু। আমরা যখন যে কাজেই থাকি না কেন নামাযের সময় হলেই আল্লাহর দরবারে ধরনা দিতে হবে। কেননা এরই মাধ্যমে মানুষের দৈহিক ও মানসিক পবিত্রতা অর্জিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন-

“নিঃসন্দেহে আমিই আল্লাহ্‌। আমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। অতএব আমার ইবাদত কর। আর আমাকে স্মরণের জন্য সালাত কায়েম কর।” (সুরা দোহাঃ১৪)

 পরিচ্ছন্নতাঃ

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধাংশ, এ পরিচ্ছন্নতা দরকার যেমন আত্মিক তেমনি দৈহিক।

আত্মার পরিশুদ্ধতা হল আত্মাকে কুফর, শিরক, নাফরমানি ও গোমরাহী অপবিত্রতা থেকে পবিত্র করা, পুতঃপবিত্র চরিত্রের অধিকারী হওয়া এবং শারীরিক পবিত্রতা হল অপবিত্র জিনিস থেকে নিজেকে পবিত্র করা।

সকল ধরনের নাজাসাত থেকে পরিচ্ছন্ন থাকা, সপ্তাহে একদিন নূন্যতম গোসল করতে হবে। অযু ও গোসল হল পবিত্রতার মাধ্যম। নিয়মিত নখ কাটা ও পরিষ্কার রাখা ও মেসওয়াক করার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে, নবী (সাঃ) বলেছেন- আমি যদি উম্মতের কষ্টের কথা চিন্তা না করতাম, তাহলে তাদের প্রত্যেক অযুর সময় মেসওয়াক করতে বলতাম।

হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, “নবী (সাঃ) একদা এক ব্যক্তিকে দেখলেন যে তিনি ধূলাবালি মিশ্রিত ময়লা কাপড় পরিধান করে এলোমেলো চুলে এসেছেন। তখন তিনি বললেন এর কাছে কি এমন কিছু নেই, যার দ্বারা কাপড় ধুয়ে পরিধান করে আসতে পারে এবং মাথা আঁচড়িয়ে আসতে পারে।”

তাই এমন নোংরা পোশাক পরিধান করা ঠিক নয়। যা অপরের ঘৃণার উদ্রেক করতে পারে। মাথা পরিপাটি রাখা ও হাঁচি দেয়ার সময় মুখে রুমাল দেয়া উচিত।

 পোশাক পরিচ্ছদঃ

মহান আল্লাহ্‌ বলেন-

“হে আদম সন্তানগণ, আমি তোমার জন্য পোশাক নাযিল করেছি। যা তোমাদের লজ্জাস্থানকে ঢেকে রাখে। এবং যা সৌন্দর্যের উপকরণ। আর তাকওয়ার পোশাকই উত্তম।” (সূরা আ’রাফ: ২৬)

­

পোশাক পরিধানের দুটি উদ্দেশ্য

১। ইজ্জত আবরু ঢেকে রাখা

২। সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা

পোশাক ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়ক। একজন ব্যক্তির পোশাকের মাধ্যমে তার রুচি, ব্যক্তিত্ব, কৃষ্টি বা স্বভাব ফুটে ওঠে। আল্লাহ মানুষকে সুন্দর আকৃতি ও দেহকাঠামো দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তিনি চান তার বান্দারা সুন্দর পোশাক পরিধান করুক। তাই পোশাকের ক্ষেত্রে ইসলামের কিছু দিক নির্দেশনা দেয়া আছে যা আমাদের মেনে চলতে হবে।

এমন পোশাক পরতে হবে যাতে সতর ঢাকা থাকে সে পুরুষ হোক কিংবা নারী। নারীর পোশাক পুরুষ এবং পুরুষের পোশাক নারীর পরিধান করা বাঞ্চনীয় নয়। মুসলমানদের জন্য অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় নির্দেশ বহনকারী পোশাক পরিধান করা ইসলাম অনুমোদন করে না। অথচ মুসলমানদের কৃষ্টি-কালচারে আজ তা ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে। রাসূল (সঃ) বলেছেন “যারা কাপড় পরিধান সত্ত্বেও উলঙ্গ থাকে তারা জাহান্নামী। তারা অপরকে সম্মোহিত করে। আর নিজেরাও অপরের উপরে সম্মোহিত হয়। তাদের মাথা প্রসিদ্ধ বুখত নগরের উটের চোটের ন্যায় বাঁকা অর্থাৎ এরা চলার সময় অহংকার বসত ঘাড় হেলিয়ে দুলিয়ে চলে। এ সকল ব্যক্তিরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের সুগন্ধ পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধ বহুদূর থেকে পাওয়া যাবে।”

আজ মুসলমানদের পোশাকের দিকে তাকালে দেখা যাবে অনেকেই পোশাক যত ফিটিংস এবং খাট হবে ততই যেন নিজেকে Smart বলে ভাবতে থাকে।

পোশাক সর্বদা নিজের ক্ষমতা ও মর্যাদা অনুযায়ী পরিধান করা উচিত। এমন পোশাক পরিধান করা ঠিক না, যা দ্বারা অহংকার বা আড়ম্বর প্রদর্শিত হয়। এবং অপরকে হেয় প্রতিপন্ন করে নিজের অর্থের প্রাচুর্য প্রদর্শন উদ্দেশ্য হয়। আবার নিকৃষ্ট মানের পোশাক পরিধান করে সম্বলহীনের বেশ ধারণ করা ও ঠিক নয়।

সহজ সরল ও সাদাসিধে চাল চলন ও পোশাক পরিচ্ছেদ এবং শালীনতাকে পছন্দ করে। যেসব পোশাকে ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায় তাকে অপছন্দ করে। একটি কথা মনে রাখা দরকার পোশাক আল্লাহ্‌র এক বিরাট স্মারক চিহ্ন। যা তিনি অন্যান্য সৃষ্টিকে দেননি। তাই এ নিয়ামত স্মরণ  করে আল্লাহ্‌র কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা উচিত।

রাসূল (সঃ) যখন কোন নতুন পোশাক পরিধান করতেন তখন তিনি সে পোশাকের নাম ধরেও দোয়া করতেন।

“হে আল্লাহ! তোমার শোকর, তুমি আমাকে এ কাপড় পরিধান করিয়েছ। আমি তোমার নিকট উহার কল্যাণকারীতার প্রত্যাশী, কল্যাণের উদ্দেশ্যে কাপড় তৈরি করা হয়েছে। আর আমাকে তোমার আশ্রয়ে দিচ্ছি। এ কাপড়ের মন্দ থেকে, কাপড় যে মন্দ উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে সে মন্দ থেকে।” (আবু দাউদ)

পুরুষের জন্য রেশমী কাপড় পরিধান করা নিষিদ্ধ। এমন আঁটসাঁট ও পাতলা কাপড় পরিধান করা ঠিক নয় যা দ্বারা শরীরের গঠন প্রকৃতি পরিলক্ষিত হয়।

আমাদের সমাজে এক শ্রেণীর লোক আছে যারা পুরান, ছিঁড়া, তালি দেওয়া কাপড় পরিধান, যাতে সম্বলহীনের বেশ ধারণ করে, এবং এটাতে পরহেযগারী বলে মনে করে। শুধু এতুটুকু যথেষ্ট নয়, বরং যারা রুচিশীল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করে তাদেরকে দুনিয়াদার বলে সমলোচনা করা হয়।

হযরত আবু আহওয়াজ (রাঃ) এর পিতা নিজের একটি ঘটনা বর্ণনা করেন যে, “আমি নবী কারীম (সঃ) এর দরবারে অত্যন্ত নিম্নমানের একটি কাপড় পরিধান করে উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন তোমার কি কোন ধন সম্পদ আছে? আমি বললাম জ্বি আছে। তিনি বললেন কি ধরনের সম্পদ আছে। আমি বললাম আল্লাহ আমাকে উট, ঘোড়া বকরী, গোলাম ইত্যাদি সর্বপ্রকার ধনসম্পদই দান করেছেন তিনি বললেন আল্লাহ তোমাকে সর্বপ্রকার ধন সম্পদ দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন। তবে তোমার শরীরেও তার দান ও অনুগ্রহের বহিঃপ্রকাশ থাকা উচিত।” (মেশকাত)

অর্থাৎ আল্লাহর নিয়ামতে শোকরিয়া আদায় করতে হবে।

একবার প্রখ্যাত সুফী হযরত আবুল হাসান আলী শাযালী অত্যন্ত উত্তম ধরনের কাপড় পরিহিত ছিলেন। দুনিয়া ত্যাগী অপর এক সূফী তাকে এমতাবস্থায় দেখতে পেয়ে প্রতিবাদ করে বললেন যে, আল্লাহ ওয়ালাদের অত মূল্যবান জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করার কি প্রয়োজন? হযরত শাযালী বললেন, উত্তম। ভাই এটা হল মহান প্রতাপশালী মহান শক্তিশালী আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। আর তোমার এ সহায় সম্বলহীনতা হলো ভিক্ষুকের ছবি, তুমি নির্বাক অবস্থার দ্বারা মানুষের নিকট ভিক্ষা প্রার্থনা করছ। প্রকৃত পক্ষে ছেঁড়া ফাটা পুরান তালি দেয়া নিম্নমানের পোশাকে যেমন পরহেযগারিতা নেই ঠিক তেমনি পরহেযগারিতা নেই অত্যন্ত মূল্যবান গৌরবময় পোশাক পরিধানের মধ্যেও পরহেযগারিতা মানুষের নিয়ত ও সার্বিক চিন্তাধারার ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃত সত্য হল মানুষ তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের ক্ষমতানুযায়ী মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে সমতা রক্ষা করে চলবে।

এ প্রসঙ্গে অন্য আর এক হাদীস স্মরণ করা যায় হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেন, “যার অন্তরে অণুপরিমান অহংকার থাকবে সে বেহেশতে প্রবেশ করবে না। এক ব্যক্তি উঠে বললো ইয়া রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক ব্যক্তি এটা চায় যে তার কাপড়খানা সুন্দর হোক, তার জুতা জোড়া উত্তম হোক। নবী (সঃ) বললেন আল্লাহ সুন্দর তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন।”

উপরি উক্ত ঘটনা এবং হাদীসের মাধ্যমে পোশাকের ধরন জানতে পারলাম। শুধু তাই নয় সুন্দর পরিপাটি জীবন হবে মুসলমানের জীবন।

“একদিন নবী করীম (সঃ) মসজিদে ছিলেন। এমতবস্থায় ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত চুল দাড়ি নিয়ে একজন লোক মসজিদে প্রবেশ করল। নবী করীম (সঃ) তাকে হাত দ্বারা চুল দাড়ি ঠিক করার ইঙ্গিত করলেন। নবী করীম (সঃ) বলেন, মানুষের চুল দাড়ি এলো মেলো থাকার চেয়ে পরিপাটি থাকা কি উত্তম নয়?

তা না হলে এমন অবস্থায় মনে হয় যে, সে যেন শয়তান।”

উপরি উক্ত হাদীসগুলোর আলোকে আমরা পোশাকের একটি নমুনা পেলাম। যা মানার মাধ্যমে আমাদের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।

কথাবার্তাঃ 

মহান আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের সামনে অগ্রণী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু শুনেন ও জানেন। মুমিনগণ তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের উপর তোমাদের কন্ঠস্বর উঁচু করো না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উচ্চস্বরে কথা বলো, তার সাথে সে রূপ উচ্চস্বরে বলো না।  এতে তোমরা তা টের ও পাবে না। যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে কন্ঠস্বর নিচু করে আল্লাহ তাদের অন্তরকে শিষ্টাচারের জন্য শোধিত করেছেন তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।” (সূরা হুজুরাত : ৪)

রাসূল (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের জিহ্বা এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে রাখার নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে, আমি তার বেহেশত প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিতে পারি। (বুখারী)

কথাবার্তা এমন একটি অস্ত্র যা দ্বারা কখনো মানুষকে বুলেটের ন্যায় ক্ষতবিক্ষত করে দেয়া যায়, আবার তা দ্বারা মানুষের শ্রদ্ধা সম্মান ও মর্যাদা লাভ করা যায়। তাই হাদীসে এ ব্যাপারে কঠোরতা পরিহারের নির্দেশ দিয়েছে।

পবিত্র কুরআনে রাসূলের (সাঃ) উদাহরণের মাধ্যমে বুঝা গেল কোন মজলিশে অথবা যখন তখন বড়দের বিরক্ত করা যাবে না। মুরব্বীদের কথা বলার ধরন দেখে ধীরে ধীরে বলতে হবে। কন্ঠস্বর উঁচু করে কথা বললে বেয়াদবি হয় এবং নিজের আমলে ঘাটতি এসে যায়। কথাকে কখনো ইনিয়ে বিনিয়ে বলা ঠিক নয় যেন অন্যের মনে কুচিন্তা হয়। আবার এতটা প্রকটভাবেও বলা যাবে না যা দ্বারা ভীতির সঞ্চার হয়।

পবিত্র কুরআনের এ আয়াত শ্রবণের পর হযরত আবু বকর (রাঃ) আরয করলেন- ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহর কসম। এখন মৃত্যু পর্যন্ত আপনার সাথে কানাকানির অনুরূপ কথা বলবো। হযরত ওমর এরপর থেকে এত আস্তে কথা বলতেন যে প্রায়ই পুনরায় জিজ্ঞাসা করতে হতো।

হযরত আবু যার (রাঃ) কে লক্ষ্য করে রাসূল (সাঃ) বলেন, যেখানেই যাক, আল্লাহকে ভয় কর, প্রতি গোনাহর পর একটি করে নেকী করবে তাতে করে গোনাহ মুছে যায়। আর মানুষের সাথে মধুর ব্যবহার করবে। “মুসলমান ভাইয়ের সাথে  হেসে কথা বলাও এক প্রকার সাদকা।” (তিরমিযী)

আচার ব্যবহার/পারস্পরিক আচরণঃ 

ইসলাম একটি উন্নত নৈতিক চরিত্র ও সুসভ্য জাতি গঠনের অঙ্গীকারের নাম। তাই এর মাঝে রয়েছে শিষ্টাচার ও পারস্পরিক মজুবত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার পন্থা। এগুলো হল-

(ক) সালাম বিনিময়ঃ-

মহান আল্লাহ বলেন “কেউ যখন তোমাদেরকে সম্ভাষণ করে তখন তার চেয়েও উত্তম সম্ভাষণ কর, অথবা অনুরূপভাবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সকল বিষয়ে হিসাব গ্রহণকারী।”   (সূরা-নিসা ঃ ৮৬)

হযরত আবু হুরাইরা (রা) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ- সে সত্তার কসম করে বলছি, যাঁর হাতে রয়েছে আমার জীবন। তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষন না তোমরা মুমিন হও। আর তোমরা পুরোপুরি মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষন না তোমাদের পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা সৃষ্টি হবে? তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রচলন করো। (মুসলিম)

সালাম দেয়া সুন্নত এবং উহার জবাব দেয়া ওয়াজিব। সালামের শব্দ যত বেশি হবে নেকীও তত বেশি হবে। এ সালামের মাধ্যমে এক মুসলিম অন্য মুসলিমের কল্যাণ কামনা করে থাকে। সালামের পর মোছাফাহ করা দ্বারা আরো বেশি সুসর্ম্পক গড়ে উঠবে।

যদিও সালাম হচ্ছে মুসলমানদের প্রথম সম্ভাষণ তবুও কিছু ক্ষেত্রে তা করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন-কোন বৈঠক চলাকালীন সময়। কেননা এতে শ্রোতা ও বক্তা উভয়ের কাজে ব্যাঘাত ঘটে থাকে। খাওয়ার সময়, বাথরুমে থাকা অবস্থায়, নামাজরত অবস্থায়।

 সাজসজ্জাঃ 

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সুন্দর, তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন। তাই একজন মুমিন ব্যক্তির পোশাক- পরিচ্ছদ, চাল-চলন, কথা-বার্তায় সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো উচিত। তবে সৌন্দর্য বৃদ্ধির চেষ্টায় এমন কোন কাজ করা ঠিক নয় যাতে আল্লাহর সৃষ্টি বিকৃত হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন-

হে নবী ! মুমিন পুরুষদের বল, তারা যেন নিজেদের চোখকে “বাঁচিয়ে চলে, এবং নিজেদের লজ্জা স্থানসমূহের হেফাজত করে। এটি তাদের পক্ষে পবিত্রতম নীতি। যা তারা করে, আল্লাহ সে বিষয়ে পুরোপুরি অবহিত। আর হে নবী, মুমিন স্ত্রীলোকদের বল, তারা যেন নিজেদের চোখকে বাঁচিয়ে রাখে এবং নিজেদের লজ্জা স্থানসমূহের হেফাজত করে ও নিজেদের সাজসজ্জা না করে দেখায় কেবল সে সব জিনিস ছাড়া যা আপনা হতে প্রকাশিত হয়ে পড়ে এবং যেন নিজেদের বক্ষদেশের উপর ওড়নার আঁচল ফেলে রাখে। আর নিজেদের সাজসজ্জা প্রকাশ করবে না, কিন্তু কেবল এই লোকদের সামনে, তাদের স্বামী, পিতা, নিজের পুত্র, স্বামীর পুত্র, নিজেদের ভাই, ভাইদের পুত্র, বোনদের পুত্র, নিজেদের মেলামেশার স্ত্রী লোক থেকে, নিজেদের দাসী, সেসব অধীনস্থ পুরুষ যাদের অন্যরকম গরজ নেই, আর সেসব বালক যারা স্ত্রীলোকেদের গোপন বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয়নি, তারা নিজেদের পা যমীনের উপর মাড়িয়ে চলাফেরা করবেনা, এভাবে নিজেদের যে সৌন্দর্য তারা গোপন করে রেখেছে, লোকেরা তা জানতে পারে। হে মুমিন লোকেরা, তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর নিকট তওবা কর, আশা করা যায় তোমরা কল্যাণ লাভ করবে। (সূরা আন নূর ঃ ৩০)

এ আয়াতের মাধ্যমে জানা যায় যে অতিরিক্ত সাজসজ্জা নিয়ে বের হওয়া নিষিদ্ধ। মহিলাদের ক্ষেত্রে বের হওয়ার সময় নিজ সৌন্দর্যকে ঢেকে বের হতে হবে।

আজকের সমাজে পত্র পত্রিকাগুলোতে নারী নির্যাতনের যে চিত্র আমরা পেয়ে থাকি, তার জন্য অধিকাংশই এরুপ সৌন্দর্য প্রকাশ করাই দায়ী। এ কারণে ইসলাম এক্ষেত্রে  সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। আল্লাহ পাক প্রত্যেক ব্যক্তির মাঝে যে রূপ বা সৌন্দর্য দিয়েছেন তাতে হস্তক্ষেপ করা মারাত্নক গুনাহ। আজকাল আল্লাহ প্রদত্ত সৌন্দর্য নষ্ট করে দিয়ে কৃত্রিম সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার চেষ্টা চলছে। এগুলো হারাম।

ভ্রু সরুকরন

মাত্রাতিরিক্ত রূপ, সৌন্দর্য অর্জনের আরও একটি পন্থা হল ভ্রু-প্লাক করা। এটিও ইসলামে সম্পূর্ণরুপে হারাম। রাসূল (সঃ) বলেন “যে স্ত্রীলোক চুল বা পশম উপড়ায় এবং যে করে তাদের উভয়ের উপর অভিশাপ।

 বন্ধুত্বঃ

মহান আল্লাহ বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোন ক্রটি করে না। তোমরা কষ্ট পেলেই তাদের আনন্দ। শক্রতা প্রসূত বিদ্বেষ তাদের মুখ ফসকে বেরোয় আর যা কিছু তাদের অন্তরে লুকিয়ে আছে তা আরো অনেক বেশি জঘন্য। তোমাদের জন্য নির্দেশ বিশদভাবে বর্ণনা করে দেয়া হলো যদি তোমরা অনুধাবন করতে সমর্থ হও।” (আল ইমরান :১১৮)

সর্বদা সৎ ও নেককার লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, বন্ধু নির্বাচনেও কথার প্রতি অবশ্যই খেয়াল রাখবে। হাদীসে আরো বলা হয়েছে-

সকল গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার উত্তম উপায় হল জিহ্বা কে সংযত রাখা। তাই ইসলামের সৌন্দর্য রক্ষার্থে এবং নিজের সম্মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিষপ্রয়োজনীয় কথা বাদ দিতে হবে।

রাসূল (সঃ) বলেছেন-

“মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তির চিন্তা করা দরকার যে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।”

চলার পথে কখনো কোন কাজে বিরোধ হলে  তর্ক বির্তক না করে সুন্দরভাবে আপোষ করার চিন্তা করতে হবে। সমস্যাকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে। প্রতিহিংসার মনমানসিকতা কমিয়ে ফেলা দরকার। একজন মুসলমান কখনো অন্য মুসলমান ভাইয়ের অকল্যাণ কামনা করতে পারে না। ইসলামের এ মহৎ দিকটি সামনে রেখে যদি মুসলমানদের জীবনাচরণ হয় তাহলে সমাজ অনেক সুন্দর হবে। রাসূল (সঃ) বলেন- “তোমরা প্রত্যেকে আপন ভাইয়ের আয়না। সুতরাং সে যদি তার ভাইয়ের মধ্যে কোন খারাপ গুণ দেখে তাহলে তার থেকে দূর করে দেবে।”

দুঃখ শোকঃ

দুনিয়ার জীবনে কোন মানুষ দুঃখ-শোক, বিপদাপদ-ব্যর্থতা ও লোকসান থেকে অভয় ও নিরাপদ থাকতে পারেনা। অবশ্য মুমিন ও কাফিরের কর্মনীতিতে পার্থক্য রয়েছে। কাফের দুঃখ ও শোকের আধিক্যের কারণে জ্ঞান ও অনুভূতি শক্তি হারিয়ে ফেলে।

নিরাশ হয়ে পড়ে এমন কি অনেক সময় শোক সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কিন্তু একজন মুমিন ব্যক্তি যে কোন বড় ধরনের দুর্ঘটনায় ধৈর্য্য হারা হয় না বরং ধৈর্য্য ও দৃঢ়তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে বলে থাকে যা হয়েছে তা আল্লাহর ইচ্ছায় হয়েছে। নিশ্চয় এতেও কল্যাণ রয়েছে।

আল্লাহ বলেন-

“যে সকল বিপদ আপদ পৃথিবীতে আপতিত হয় এবং তোমাদের ওপর যে সকল দুঃখ-কষ্ট পতিত হয় এ সকল বিষয় সংঘটিত করা পূর্বেই এক পুস্তক (লিপিবদ্ধ, সংরক্ষিত ও গৃহীত অবস্থা) থাকে। নিঃসন্দেহে ইহা আল্লাহরপক্ষে সহজ। যেনো তোমরা তোমাদের অকৃতকার্যতার ফলে দুঃখ অনুভব না কর।”

নবী করীম (সঃ) বলেন “যখন কোন বান্দাহ বিপদে পড়ে তখন আল্লাহ তাআলা তার বিপদ দূর করে দেন, তাকে পরিণামে উত্তম পুরস্কার দান করেন আর তাঁকে এর প্রতিদান স্বরূপ তার পছন্দনীয় বস্তু দান করেন।”

একজন মুমীন সামান্য কষ্টেও আল্লাহকে স্মরণ করবে।

একবার নবী করীম (সঃ) এর চেরাগ নিভে গেলে তিনি দোয়া পাঠ (ইন্না…….রাজিউন) করলেন। জনৈক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ চেরাগ নিভে যাওয়াও কি কোন বিপদ? আল্লাহর নবী বললেন, হ্যাঁ যার দ্বারা মুমীনের কষ্ট হয় উহাই বিপদ।”

এসম্পর্কে হাদীসে আরো বলা হয়েছে-

হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেন, পরীক্ষা যত কঠিন ও বিপদ যত বড় হয় তার প্রতিদানও তত সহজ ও বিরাট হয়। আল্লাহ যখন তাঁর কোন দাসকে ভালবাসেন তখন তাদেরকে পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। সুতরাং যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিতে সন্তুষ্ট হন আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হন। আর যারা এ পরীক্ষার কারণে আল্লাহর প্রতি অসন্তুষ্ট হয় আল্লাহও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হন।  (তিরমিযী)

অন্যের দুঃখে একজন মুমীন দুঃখ প্রকাশ করবে এবং সাধ্যমত সাহায্য সহযোগিতা করবেও সমবেদনা সান্ত্বনা দান করবে।

হাদিসে আছে “যে ব্যক্তি কোন বিপদগ্রস্থকে সান্ত্বনা প্রদান করল সে এমন পরিমাণ সওয়াব পাবে যে পরিমাণ সওয়াব বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি পাবে।”

রাসূল (সাঃ) যখন কোন বিষয়ে অধিক চিন্তিত হয়ে যেতেন তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে “সুবহানাল্লাহিল আযীম” আর যখন অধিক কান্নায় ভেঙ্গে পড়তেন তখন ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুম বলতেন।

এছাড়া বিভিন্ন দোয়া পড়া উচিত।

 দায়িত্ব কর্তব্যঃ

নিজের উত্তম চরিত্র ও নম্র স্বভাবের পরীক্ষা ক্ষেত্র হল পারিবারিক জীবন। পরিবারের লোকদের মাঝেই সব সময় সম্পর্ক থাকে আর ঘরের অকপট জীবনেই স্বভাব ও চরিত্রের প্রতিটি দিক ফুটে ওঠে। ঐ ব্যক্তিই পূর্ণ মুমীন যে পরিবারের লোকদের সাথে উত্তম চরিত্র, হাসিমাখা ও দয়াসুলভ ব্যবহার করে। পরিবারের লোকদের অন্তর আকর্ষণ করবে এবং স্নেহও ভালবাসা প্রদান করবে।

পরিবারের সদস্য হল মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান তাদের প্রতি নজর দিতে হবে। জীবনের কিছু কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। আল্লাহ ও রাসূলের পর মানুষের ওপর সবচেয়ে বড় অধিকার হল পিতা-মাতার।

হযরত আবু উমামা বলেছেন- “এক ব্যক্তি নবী করীম (সাঃ) এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সন্তানের ওপর পিতামাতার কি অধিকার? তিনি বললেন, মাতা-পিতাই তোমার বেহেশত এবং দোযখ।”  (ইবনে মাজাহ)

তাই সন্তানদের এমন কোন কাজ করা ঠিক নয় যা দ্বারা পিতা মাতার সম্মান নষ্ট হয়। পিতা মাতার সাথে সর্বদা নম্র ব্যবহার করা এবং সেবাযত্ন ও আর্থিক অভাব পূরণ করা সন্তানের কর্তব্য।

হযরত আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (সাঃ) বলেছেন-

যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় ভোর করল যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর পবিত্র কুরআনে মাতা পিতার সম্মানে যে নির্দেশ দান করেছেন তা পালনে আল্লাহর আনুগত্য করেছে তা হলে সে এমন অবস্থায় ভোর করল যে, তার জন্য বেহেশতের দুটি দরজা খোলা। আর মাতা পিতার মধ্যে থেকে একজন জীবিত থাকলে এক দরজা খোলা। যে ব্যক্তি এ অবস্থায় ভোর করল যে, মাতা পিতা সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে সে এমন অবস্থায় ভোর করল যে, তাঁর জন্য দোজখের দুটি দরজা খোলা আর তার মাতা-পিতার মধ্য থেকে একজন জীবিত থাকলে দোজখের একটি দরজা খোলা সে ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল আর আল্লাহর রাসূল মাতা-পিতা যদি তার সাথে সীমা অতিক্রম করে তবুও কি? রাসূল (সাঃ) বলেছেন তবুও। এভাবে তিনি ৩ বার বললেন।

অপর দিকে পিতামাতার কর্তব্য হল সন্তান জন্ম দানের পর থেকে সুন্দর নাম রাখা আর উত্তম আদব ও সামাজিক শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া।

তেমনিভাবে স্বামী স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক, সর্বদা উভয়ই উভয়ের চাহিদা মান মর্যাদা অনুযায়ী চলার চেষ্টা করতে হবে। যে সকল কারণে স্বাম  অসন্তুষ্ট হতে পারে এমন কোন কথা বা কাজ করা বাঞ্ছনীয় নয়। স্বামীর সম্পদ, সন্তান সন্ততির রক্ষণাবেক্ষণ করা কর্তব্য।

সন্তান-সন্ততির শিক্ষাদীক্ষার, উত্তম আচরণ শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব পিতামাতার। তাই একজন সন্তান জন্মের পর পিতামাতার কর্তব্য হল তার সুন্দর নাম রাখা এবং প্রতিটি বয়সে তাকে তার কার্যাবলীতে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা, যেন বড় হয়ে এ সন্তান দেশ ও জাতির সম্পদে পরিণত হতে পারে। সন্তান গঠনে মায়ের ভূমিকা বেশি। তাই নেপোলিয়ান বলেছিলেন- “আমাকে একজন আদর্শ মা দাও তাহলে আমি তোমাদের একটি আর্দশ জাতি উপহার দিব।”

পরিবারে সংকীর্ণ পরিধির বাইরে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা একজন ঈমানদার ব্যক্তির কর্তব্য। কেননা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। তাই আত্মীয়ের সুখে-দুঃখে, অভাব-অনটনে সাহায্যের হাত প্রসারিত করতে হবে।

সংসারে কাজের প্রয়োজনে অনেক সময় গৃহ পরিচালিকার প্রয়োজন হয়। তাদের সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলামের নিয়ম মেনে চলতে হবে। রাসূল (সাঃ) এক্ষেত্রে নির্দেশ দিয়েছেন তাদের উত্তমরূপে ভরণ-পোষণ দিতে। নিজেরা যা খাবে, পরবে সেরূপ পোশাক পরিধান করাবে, থাকার ব্যবস্থা করবে কখনও প্রহার করা যাবে না। যদি পছন্দ না হয় তাহলে মুক্ত করে দিতে হবে। পত্র-পত্রিকাগুলোতে দেখা যায় গৃহপরিচালিকার উপর লোমহর্ষক নির্যাতন এবং মৃত্যু। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেন তারা কোন মানুষই না, যেন সমাজের এক অবাঞ্ছিত অংশ। একজন মানুষ দুর্বল বলে তার সাথে এত অমানবিক আচরণ করা কোন ব্যক্তির অধিকারে নেই। এ ব্যাপারে যেমন প্রত্যেক  ব্যক্তির সচেতন হওয়া দরকার তেমনি দরকার আমাদের আইনের যর্থাথ প্রয়োগ।

এছাড়াও  একজন মুমীন ব্যক্তির যা অর্জন ও বর্জন করা দরকার তা নিম্নরূপঃ

যা অর্জনীয়ঃ 

১. সর্বদা আল্লাহর স্মরণকারী।

২. আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল কারী।

৩. ওয়াদা রক্ষা, আমানতের খেয়ানতকারী না হওয়া,

৪. দিনে রাতে আল্লাহর ইবাদতকারী।

৫. প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে আল্লাহর সৈনিক হওয়া।

৬. আখিরাতে জবাবদিহিতার ভয়ে দুনিয়ার জীবনকে সময়োপযোগী করে ব্যবহার করা।

৭. সর্বদা জান্নাত লাভ আকাঙ্খিত এবং জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ লাভে কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি করা।

৮. সর্বদা তওবা ও ইসতেগফার করা।

৯. বেশি বেশি জিকিরে অভ্যস্ত হওয়া।

১০. শরীর ও মনকে কলুষতামুক্ত রাখা।

যা বর্জনীয়ঃ

১. মিথ্যা বলা।

২. গীবত, গোয়েন্দাগিরি ও সন্দেহ না করা।

৩. প্রতারনা, অপব্যয় বর্জন করা।

৪. দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা পরিহার করা।

৫. বিদ্রুপ ও উপহাস না করা।

৬. মুনাফিকী পরিত্যাগ করা।

৭. মদ, জুয়া, রিবা হতে দূরে থাকা।

৮. ব্যভিচার, চুরি হতে বেঁচে থাকা।

৯. দুনিয়া পূজারী না হওয়া।

পরিশেষে বলা যায়, ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা কেবল কিছু আচার অনুষ্ঠানের নাম নয় বরং জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগে রয়েছে এর পদচারণা। এদিকে নির্দেশনাগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে মানার মাধ্যমে প্রকৃত মুসলমানের পরিচয় পাওয়া যাবে। কিন্তু পরিত্যাগের বিষয় আজ মুসলমানদের জীবনে ইসলামের এ শিষ্টাচার নেই বললেই চলে। মুসলমান হিসাবে তারা যে অন্যান্য মানুষের চাইতে পৃথক উম্মত তারা ভুলে গেছে। তাই দেখা যায় তারা হালাল হারাম জানে না। চুরি, ডাকাতি, লেনদেন, ছল-চাতুরীর মালপত্র বিক্রি সকল অপরাধে মুসলমানদের লিপ্ত থাকতে দেখা যায় শুধু তাই নয় এ অবস্থা শিক্ষিত অশিক্ষিত সবার মাঝে দেখা যায়। পোশাক, ওঠা-বসা, চলা-ফেরা, শিক্ষা-দীক্ষা সাহিত্য-সংস্কৃতি সবকিছুতেই আজ মুসলমানরা বিজাতীয় ও বিধর্মীদের কাছ থেকে ধার করেছে। ইসলামে আজ সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, শাসননীতি সবই বাদ দিয়ে তদস্থলে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, রাশিয়া, চীন ইত্যাদি দেশের অনুকরণ আজ সর্বত্র। অথচ মুসলমানদের আল্লাহ দায়িত্ব দিয়েছেন ইসলামকে দুনিয়ায় প্রচার প্রসার করতে। এ অবস্থার কারণে আজ মুসলমানদেরকে লাঞ্ছিত অপমানিত হতে হচ্ছে। কোথাও বা হতে হচ্ছে রাজ্যহারা। ইসলামের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার কারণে আল্লাহর সাহায্য ও মদদ পাওয়া যাচ্ছে না।

তাই আজ আমাদের ইসলামকে পূর্ণাঙ্গভাবে মানার অঙ্গীকার করা দরকার। তবে অজ্ঞতার মধ্যে নয় ইসলামী জ্ঞানার্জনের মাধ্যমেই তা মানার চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দিন। আমিন।